নড়াই নদীর পাড়ে আমার ছেলেবেলা | ফজলে সানি

0
329

ফজলে সানি: সেই সত্তর দশকের কথা স্মরণ করছি, বছরের দুইটা সময়-কাল, গরম আর শীত। প্রথমে আসে শীতকাল, সকালে কুয়াশা ঘেরা পরিবেশে ভূইয়াপাড়া মেরাদিয়া অঞ্চলটা যেন সবুজের সমারোহ। ধানক্ষেত গুলি দিগন্তের সাথে বিলীন হয়ে আছে নড়াই নদী পাড় ধরে। বাতাসে ঢেউ খেলছে নদীর ঢেউর সাথে মিল রেখে সেই ছেলেবেলা! মা বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বাড়ির পাশে কিছু বন্ধু-বান্ধবদের সাথে চলে যেতাম ধানক্ষেতের আইল ধরে নড়াই নদীর পাড়ে। ধানক্ষেতের সেই মাতাল গন্ধে মন মাতাল হাওয়ায় চলতাম ধানক্ষেতের ছোঁয়ায়। মাঝে মাঝে বিন্তীর্ণ মাঠ চোখে পড়তো গরু-ছাগলের অবাধ বিচরণ, বিস্তীর্ণ মাঠের উপর শুকনো ধান গাছের খড়কুটো দিয়ে পাহাড়ের মতো ন্তুপ। মনে পড়ে এই স্তুপের মাঝে লুকিয়ে পড়তাম খড়কুটোর আড়ালে লুকোচুরি খেলতাম। তখন বুধবার ছিল হাটবার।

নড়াই পাড়ের অধিবাসীরা ঐ দিন সকাল থেকেই প্রস্তুতি নিত হাটের উদ্দেশ্যে। ভোর বেলায় নড়াই নদী পথ ধরেই বাবার হাত ধরে বিস্তীর্ণ শস্যের মাঠের আইল ধরে চলে যেতাম সেই ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী মেরাদিয়া হাটে। আমরা বলতাম বুধবারের হাট ঠিক নদীর পাড়েই হাটের অবস্থান ছিল। সুবিশাল দুটি বটগাছের নিচে হাটের অবস্থান ছিল তিনটি খালের মুখে। পূর্বদিকে ‘যুক্কা’ নামে একটি খাল ছিল আর উত্তর দিকে খালটি ‘হিজল গাছের তলা’ খাল নামে পরিচিত মূলত এ খালটি নাম গজারীয়া খাল। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই দুটি খালই সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। বড় হাউজিং কোম্পানীর দখলের কারণে নড়াই নদীর পাড়ে এই হাটে শত শত ছোট-বড় নৌকা জমায়েত হতো। নানা ধরনের মানুষ জমায়েত হতো হাট এর উদ্দেশ্যে। নাম না জানা কোন প্রাম থেকে ভিনদেশী মানুষ আসতো এই হাটে বেঁচা কেনার জন্য।

নড়াই নদীর পাড়ের মেরাদিয়া হাট বাঁশ বিক্রির জন্য বিখ্যাত ছিল। বিভিন্ন ধরনের বাঁশ পাওয়া যেত এই হাটে। বাঁশের হাট বলা যেতে পারে। তবে মেরাদিয়া হাটের উত্তর পাশে বড় বটতলা নিচেই এই বাঁশের হাটের অবস্থান ছিল। উত্তর-পূর্ব পাশে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি পাওয়া যেত বিশেষ করে বালুসা মিষ্টি এবং বালিশ মিষ্টি হাটের একটা ঐতিহ্য ছিল। তা ছাড়া কড়ি ভাজা মুরালি নামে আমরা চিনতাম। কাট বিস্কুট, নিমকি আরো কত কি। তাছাড়া খিরাই বিক্রেতাদের স্তুপ থাকত আমরা ডজন হিসাবে খিরাই কিনে নিতাম। হাটের পশ্চিম দিকে মাছ তরিতরকারি বাজার বসতো অবশ্য শুটকি মেরাদিয়া হাট এর একটি ঐতিহ্যবাহী বস্ত।

হাটের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আরেকটি বটগাছ ছিল সেখানে বিভিন্ন কাপড় চোপড় বিক্রি হতো। ছেলে বেলায় প্রতি সপ্তাহেই আমাদেও প্রস্তুতি থাকতো বুধবারের হাটে যাওয়ার জন্য। বাবার সাথে বায়না হতো বা পাশের বাড়ির কেউ হাটে যেতে চাইলে তার সাথে যাওয়ার জন্য বায়না হতো। কি যে আনন্দ পেতাম তা বোঝাতে পারবো না। শীতকালে নড়াই নদী পাড় দিয়ে হাটে যাওয়া একটি ভিন্ন স্বাদ পেতাম। অবশ্য আমার বাসা অর্থাৎ ভূইয়াপাড়া মিনারা মসজিদ হতে মেইন রোড দিয়েই হাটে যাওয়া হতো বেশি। চৌধুরী বাড়ির মোড় থেকে হাটে যাওযার পথটি ছিল ইটের সলিং করা, সেই সময়কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী চৌধুরী সাহেব নিজ অর্থায়নে এই রাস্তাটা ইটের সলিং করে দিয়ে ছিলেন। কারণ নয়াপাড়া এলাকায় তার একটা ইটের ভাটা ছিল তার অবদানের কথা মেরাদিয়াবাসী সবসময় মনে রাখবে। এখানে উল্লেখ্য যে এই হাটটি তৎকালীণ সময়ে থেকে আজ অবধি মেরাদিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘বড়বাড়ি’ হাজী আনসার আলীর বংশধরেরাই পরিচালনা করেছিল এখনও করছে।

মনে আছে, বাবা তখন বাঁশের চিকন অংশ যা আমরা জিংলা বাঁশ বলতাম মাথায় করে আঁটি বেঁধে নিয়ে আসতাম। মাঝে মাঝে রাস্তার স্বল্পতার আনার জন্য নড়াই নদীর পাড় দিয়ে হিন্দুপাড়ার ভিতর দিয়ে অলি বাড়ি (নয়াপাড়া) ভিতর দিয়ে ভূইয়াপাড়া আসতাম নদীর পাড় দিয়ে। ফিরে আসার সময় দেখতাম জেলেরা ঝাকি জাল মাছ ধরছে কিছু কিছু জায়গায় বান্ধাজাল পেতে রাখতো এ যেন মাছের অভায়ারন্য। মাঝে মাঝে নদীর পাড় দিয়ে হাঁটার সময় কাঁদা মাটি পার হতে হতো শামুক ঝিনুকের বিচরণ দেখা যেত। নদীর পাড় দিয়ে দূরে সাদা বকের ঝাঁক উড়ে যেত। মাছরাঙ্গা পাখি প্রায়সই চোখে পড়তো রামপুরাবাসী যারা মেরাদিয়া হাটে আসতো তারা নড়াই নদী দিয়ে নৌকা ছাড়া উপায় ছিল না। মাদারটেক, বাসাবো এবং নন্দীপাড়াবাসীরা বেশিভাগই ‘যুক্কাখাল’ দিয়ে আসতো বেশীরভাগ মানুষ। কোষা নৌকা, ছৈওয়ালা পাল তোলা নৌকা ব্যবহার করতো। মাঝে মাঝে ছোট লঞ্চ দেখা যেত প্রায়শই বিয়ের অনুষ্ঠান হলেই লঞ্চে দিয়ে বর-কনেসহ বিয়েবাড়ির মানুষ মাইক দিয়ে গান বাজাতে বাজাতে যাতায়াত করতো। একবার মনে আছে মেরাদিয়া হাট এর কাছাকাছি নদীর পাড়ে হেলিকপ্টার নেমেছিল সেই হেলিকপ্টার দেখার জন্য আমরা ভূইয়াপাড়া থেকে দলে দলে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা গিয়ে ছিলাম। ছোট নালা পাড়ি দিয়ে কাঁদা মাটি পার হয়ে গিয়েছিলাম আজও মনে পড়ে সেই দিনের কথা। শীতের সকালে, কখন খেলার মাঠে যাবো এই চিন্তাই ঘুরপাক খেত সারারাত যদিও আমি খেলাধুলার তেমন একটি ভালো পারতাম না তবুও খেলা দেখতে চলে যেতাম। আর সেই বিস্তীর্ণ মাঠে খেলার মাঠে বসে থাকতাম চান্সে থাকতাম যদি কোন পক্ষেও প্লেয়ার কম থাকে তখন আমার সুযোগ হতো। সেই সুখ আজও মনের ভিতর বয়ে বেড়াই সারাক্ষণ। শীতের বিকেলে দেখা যেত বড় ভাইয়েরা চাচারা ভলিবল খেলার আয়োজন দু-একবার খেলার সুযোগ হয়েছে আমার। এতেই খুশি আমি মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে তাদের ক্ষেতখামারী পরিদর্শন করতে যেতাম নড়াই নদীর পাড়, মেরাদিয়া হিন্দুপাড়া এলাকায় একটি বট গাছ ছিল সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মূর্তি বটগাছের পাড় ডুবানো হতো ভয়ে আমরা যেতাম না। কেমন যেন গাঁ ছমছম করতো নীরব নিস্তব্ধতা আবরণে ছিল সেই পরিবেশটা। ওই বট গাছটি নড়াই নদীর পাড়েই ছিল শীতের দুপুরে মাঝে মাঝে দেখা যেত শকুনের বিচরণ তখন আমরা চোখ চোখে হাত দিয়ে রাখতাম শুনতাম শকুনের চোখ নিয়েযায়। দুইহাত চেপে চোখ বন্ধ করে রাখতাম শকুনের দেখা নড়াই নদীর পাড়ে আমার ছেলেবেলা।

লেখক: ফজলে সানি, কেন্দ্রীয় সদস্য, নোঙর

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে