‘নদী আমাদের প্রাণ-প্রকৃতির রাজপথ’

0
4
সুমন শামস

নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদী আমাদের প্রকৃতির রাজপথ।তাই নদ-নদী ও প্রাণ-প্রকৃতি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।কারণ আমাদের সামষ্টিক জীবনে নদীর অবদান অপরিসীম।

এ বছর বিশ্ব নদী দিবস পালিত হচ্ছে এমন সময়, যখন বিশ্ব জলবাযূ পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থা দেশের র্শীষ তলিকায় রয়েছে নদীমাতৃক বাংলাদেশের নাম।এ পরিস্থি মোকাবেলা করতে হলে দেশের সকল নদ-নদী রক্ষায় নিয়োজিত সরকারী, বেসরকারী, সামাজিক, সংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং সংসদীয় অঙ্গীকার পালন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।সেই সাথে বাংলাদেশের আইন প্রনয়নকারী নির্বাচিত সকল সংসদ সদস্যদের নদী ও প্রাণ-প্রকৃতি সংরক্ষণে নিজেদের আরো গভীর ভাবে সচেন করার মাধ্যমে জাতীয় সংসদ কে ‘সবুজ সংসদ’ ঘোষণা করে আর্ন্তজাতিক ভাবে নদী ও প্রাণ-প্রকৃতির পক্ষে দৃষ্টান্তমূলক উধারণ সৃষ্টি করতে হবে।তবেই নদী তার আপন গতি ফিরে পাবে।আমরার জানি যে নদী দখল-দূষণের মতো যে কোন ধরণের জাতীয় ভাবে সমস্যা সৃষ্টি হলে তখন ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে দলমতের উর্দ্ধে উঠে রাজনৈতিক ভাবে সমাধান করতে হয়।

দীর্ঘ দিন থেকে দেশের নদী বাঁচাতে বিভিন্ন পরিবেশবাদি সংগঠনের তৎপরতায় দেশের সর্বচ্চ বিচার বিভাগ মুমূর্ষ নদীর আর্তনাদ শুনে নদী পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।আদালতের রায় ও নির্দেশনা অনুযায়ী এখন নদী দখল এবং দূষণ ছড়ানো  ফৌজদারি অপরাধ। এ জন্য ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।  তবু আমাদের নদীর ওপর নির্যাতন থামছেই না।দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতি দিন চলছে নদী দখল। আর আমাদের নদীর পানি হচ্ছে আরো দূষিত!

নদী রক্ষায় আদালতের এক রায়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে ১৩শ’ নদীর দেশ বলা হলেও বর্তমানে তা নেই। দেশে দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ৭১০টি। এর মধ্যে ৩শ’বড় নদী ও ৪শ’শাখা-উপনদী রয়েছে। আন্তর্জাতিক নদী হিসাব পরিচিত ৫৭টি নদী। এর মধ্যে ভারত থেকে প্রবাহিত ৫৩টি নদী, বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবাহিত ১টি ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়েছে ৩টি নদী।

২০১৯ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের  বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী সারাদেশে নদী দখলদারের সংখ্যা ৬৩ হাজার ২৪৯ জন। সেই বছরই কমিশনের তত্ত্বাবধানে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নদ-নদীর অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করা হয়েছিল। তখন সারাদেশের নদী দখলদারের সংখ্যা ছিল ৫৭ হাজার ৩৯০। উচ্ছেদও করা হয় ১৮ হাজার ৫৭৯টি অবৈধ দখল। পরের বছর ২০১৯ সালে সারাদেশে নতুন করে দখলদারের সংখ্যা পাঁচ হাজার বেড়ে গেছে।

কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য মতে খুলনা বিভাগে দখলদারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ১১ হাজার ২৪৫ জন। এবং সবচেয়ে বেশি দখলের শিকার হয়ে ময়ূর নদ এখন মৃত প্রায়। সবচেয়ে কম দখল হয়েছে সিলেট বিভাগের নদী( দুই হাজার ৪৪)। আর এখানে সবচেয়ে বেশি দখল করা হয়েছে সুরমা নদী। ঢাকা বিভাগে নদী দখলদারের সংখ্যা মোট আট হাজার ৮৯০ জন। এবং এ জেলায় সবচেয়ে বেশি দখল হয়েছে শীতলক্ষ্যা নদী। তারপার বরিশালে ৮ হাজার ৬১১, ময়মনসিংহে ৪ হাজার ৮৪৮, চট্টগ্রামে ৪ হাজার ৭০৪, রংপুরে ২ হাজার ৭৬০ এবং রাজশাহীতে ২ হাজার ৪৪ জন দখলদার রয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুসারে, সারাদেশে উচ্ছেদ হয়েছে ১৮ হাজার ৫৭৯টি। উচ্ছেদের হার ৩২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। কিন্তু নতুন করে দখল হওয়ায় এবং করোনাকালীন পরিস্থিতিতে উচ্ছেদ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ থাকায় উচ্ছেদের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ১৯৬৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৩৭ বছরে দেশের ১১৫টি নদ-নদী শুকিয়ে মৃতপ্রায় এবং গত ২০ বছরে দেশে ৪৩টি নদী শুকিয়ে গেছে।

নদী ও প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায়  আমাদের সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। এবং সে অঙ্গীকার রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের। আমাদের নদী পরিদর্শনে প্রতিনিয়ত দেখছি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের সাখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানও নদী দখল করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার নদী দখলকে যৌক্তিক হিসাবেও প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।এভাবে আমাদের অযত্নে-অবহেলায় ১৯৬৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৩৭ বছরে দেশের ১১৫টি নদ-নদী শুকিয়ে মৃতপ্রায় এবং গত ২০০০ থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ৪৩টি নদী মরে গেছে।

আদি বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে একাধিক সরকারী প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা গড়ে উঠেছে। বিশেষ কুড়ারঘাট, বুলুর ঘাটের ওপাড়ে নদীর জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে একটি সরকারি হাসপাতাল। তার পাশেই পশ্চিম রসুলপুরে নদীর বুকের উপড় গড়ে তোলা হয়েছে একটি সরকা্রী বিদ্যুৎ ষ্টেশন।তার পাশেই মেটাডোর কোম্পানী, পান্না বেটারী, মসজীদ-মাদ্রাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিকদার মেডিকেলসহ অসংখ্য সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে ঢাকার চার পাশের নদ-নদী দখল করে। এ সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের দখলের কারণে আদি বুড়িগঙ্গা নদীসহ বিভিন্ন নদী দখলে মেতে উঠেছে নদীখেকো ভূমিদস্যুরা’।

নব্বুই দশকের পরেও আদি বুড়িগঙ্গা নদীতে জোয়ার-ভাটার প্রবাহ ছিলো। আদালতের আইন অমান্য করে এখনও দখলের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নদীখোকোরা। আদি চ্যানেলের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কোম্পানির নামে সাইনবোর্ড ঝুলছে।গত দুই যুগ ধরে চলতে থাকা আদি বুড়িগঙ্গা নদীর জায়গা দখলের কবলে পড়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, লালবাগ, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া রাজধানীর পশ্চিমের বুড়িগঙ্গার এই আদি চ্যানেলের প্রায় ৩৫০ একর বেদখল হয়ে গেছে। এ ছাড়াও সিটি কপোর্রেশনের সকল বর্জ্য, আবর্জ্যনা ভরাট কাজের বিষেশ সহযোগিতা করছে। যে কারণে মেটাডোর কোম্পানী, পান্না বেটারী, সিকাদার মেডিক্যেলেসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান আদী বুড়িগঙ্গা নদীর অস্তিত্ব বিলীন কর অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলে রিকশার গ্যারেজ থেকে শুরু করে টেম্পুস্ট্যান্ড, অবৈধ মার্কেট, ট্রাকস্ট্যান্ড, বাড়িঘর, এমনকি মসজিদ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে। বছরের পর বছর এসব অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠলেও সেসব দখল প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো নির্বিকার ভূমিকা পালন করে চলেছে।

নদী ও প্রাণ প্রকৃতি নিরাপত্তার সামাজিক সংগঠন নোঙর বাংলাদেশের দাবির প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট তুরাগ নদীসহ দেশের সকল নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রাণ ফিরে পাচ্ছে না আমাদের নদীগুলো!

তাই ‘নোঙর’ চায় সেনা বাহিনীর সহযোগিতায় দেশের সকল নদী দখলমুক্ত করে নদীর সাথে শাখা নদী এবং খালের সীমানা পিলার স্থান করে নৌপথে ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করা হোক।

নিরাপদ নদীর জন্য নোঙর এর ৯ দফা দাবি:

১. ২৩ মে, জাতীয় নৌ-নিরাপত্তা দিবস ঘোষাণা।

২. সকল নদী ও খালের উপর থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে স্থায়ী সীমানা পিলার স্থাপন করা।

৩. নদী রক্ষায় দেশজুড়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা।

৪. সকল খালের উপর থেকে কালভার্ট অপশারন করে নদীর সাথে সংযোগ করা।

৫. নদীর উপড় স্বল্প উচ্চতার সেতু অপসারণ করে নৌযান চলাচল উপযোগী সেতু নির্মাণ করা।

৬. নদী ও শাখা নদী এবং খালের উভয় তীরে বৃক্ষ রোপণ করা।

৭. জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুস্বাক্ষর করা।

৮. ফারাকাক্কা এবং তিস্তা নদীসহ সকল অভিন্ন ৫৭টি নদীর উৎসের বাধ অপশারণ করা।

৯. প্রতিবছর শ্রেষ্ঠ নদীকর্মী হিসাবে ‘বঙ্গবন্ধু পদক’ প্রদান চালু করা।

লেখক: সুমন শামস, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, নোঙর বাংলাদেশ।[email protected]

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে