নদী রক্ষা ও নদী কমিশন

    0
    712

    {CAPTION}

    ড. আইনুন নিশাত,  নদী ও পানি বিজ্ঞানী।

    ……………………………………………………………

    শনিবার, ৩১/১২/১৬ নোঙর নিউজডটকম: গত সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে, রাজধানীর একটি মিলনায়তনে নদী রক্ষা বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। আলোচনা সভার উদ্যোক্তা ছিল জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। জাতীয় সংসদের এক সিদ্ধান্তবলে ২০১৩ সালের জুলাই মাসে সংস্থাটি গঠনের গেজেট প্রকাশ হয়েছিল। কমিশন গঠন হয় আরও পরে; বয়স বছর দুয়েক হবে। কমিশন এখনও জোরেশোরে কাজ করছে বলে কোনো লক্ষণ দেখছি না। অবশ্য তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যে সুষ্ঠুভাবে পালন করবেন, সে বিষয়ে কথাবার্তা বলা শুরু করেছেন। এটা ইতিবাচক। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন-২০১৩-এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে- ‘নদীর অবৈধ দখল, পানি ও পরিবেশ দূষণ, শিল্প কারখানা কর্তৃক নদী দূষণ, অবৈধ কাঠামো নির্মাণ ও নানাবিধ অনিয়ম রোধকল্পে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নদীর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং নৌ পরিবহনযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলাসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজনে’ এই কমিশন গঠন করা হলো। কমিশনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পড়লে এবং তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলে এর সঠিক বাস্তবায়ন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদৌ সম্ভব কি-না, এ রকম একটি ভীতির সঞ্চার হয়। সেমিনারের আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপকদের, প্রবন্ধগুলোর নির্ধারিত ও অনির্ধারিত আলোচকদের মন্তব্য থেকে কয়েকটি কথা ঘুরেফিরে এসেছে। যেমন কমিশনের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে, নদীর অবৈধ দখল বন্ধ করা এবং দখলকৃত ভূমি পুনরুদ্ধার করা। সভায় একের পর এক আলোচক প্রশ্ন তুলেছেন, এই অবৈধ দখলদার কারা? এরা তো গরিব-দুঃখী, জনসাধারণ নয়; এরা হচ্ছে সমাজের উচ্চবিত্ত ও ক্ষমতাধর শ্রেণি থেকে আসা কিছু শক্তিশালী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী। এ ধরনের অবৈধ দখলদারদের মধ্যে কখনও কখনও সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামও উলি্লখিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ অবৈধ দখল বন্ধ করার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এবং দখলিকৃত ভূমি পুনরুদ্ধার করতে হলে কমিশনকে তথা সরকাকে অত্যন্ত কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। প্রয়োজন হবে প্রশাসন যন্ত্রের সক্রিয় ভূমিকা। আলোচনায় দুঃখ প্রকাশ করা হয় যে, বহু ক্ষমতাধর আধিকারিক, বিশেষত জেলা প্রশাসনের বড় কর্তারা নদী দখল প্রক্রিয়ায় সক্রিয় সহযোগিতা করে থাকেন। তারা তাদের নাকের ডগায় চলমান দখল প্রক্রিয়া বন্ধ করার চেষ্টা তো করেনই না; বরং অধিকাংশ সময়ে চোখ-মুখ-কান বন্ধ রেখে অন্ধ, বোবা ও কালা সেজে থাকেন। প্রশ্ন হচ্ছে, নদী কমিশনের ক্ষমতা আছে কি, যার মাধ্যমে তারা নদী দখল রোধ ও দখলিকৃত নদী পুনরুদ্ধারে বা দখলমুক্ত নদী পুনর্দখল রোধে সরকারকে সক্রিয় করতে পদক্ষেপ নিতে পারবেন? কমিশন আইনের ১২ নম্বর ধারা পড়লে মনে হয়, তারা কেবল বিভিন্ন কাজে সুপারিশ করতে পারবেন। অন্যদিকে আইনটির ৩ নম্বর ধারায় বলা রয়েছে- কমিশন নিজ নামে মামলা দায়ের করতে পারবে। তবে ৩ নম্বর ধারাটির আরও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ১২ নম্বর ধারায় বিভিন্ন বিষয়ে যে সুপারিশসমূহ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা যদি প্রতিপালিত না হয়, তাহলে কমিশনের হাতে আর কোনো হাতিয়ার আছে কি-না, বিষয়টি স্পষ্ট নয়। অবশ্য আইনের ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে, কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে কমিশন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অপারগতার কারণ সন্ধান করে তা লিপিবদ্ধ করবেন এবং জাতীয় সংসদকে অবহিত করবেন। দেখা যাচ্ছে- কমিশনকে বহু কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে তা হবে সুপারিশধর্মী, প্রয়োগধর্মী নয়। অর্থাৎ দায়িত্ব আছে; কিন্তু প্রত্যক্ষ ক্ষমতা নেই। আবার ঘুরিয়ে বললে বলা যায় যে, সুপারিশ পালন না করলে কমিশন যথেষ্ট হৈচৈ করতে পারে। অর্থাৎ কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়ার যে ক্ষমতা সেটি যথেষ্ট কি-না কিংবা যতটুকু ক্ষমতা আছে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পন্থা বের করার দায়িত্বও কমিশনকে নিতে হবে। নদী রক্ষা কমিশন আইনে দূষণ রোধ সম্পর্কে নির্দেশাবলি অবশ্য অত্যন্ত পরিষ্কার। বলা হয়েছে, পানি ও পরিবেশ দূষণ এবং শিল্প কারখানা কর্তৃক নদী দূষণ রোধ করার জন্য এই কমিশন কাজ করবে। এই কাজ করার জন্য প্রয়োজন ‘এনভায়রনমেন্টাল কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড’। অর্থাৎ কতটুকু দূষণ হলে নদী রক্ষায় কমিশন নড়েচড়ে বসবে। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ। বলে নেওয়া প্রয়োজন যে, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে দূষণের মাত্রা নিয়ে মাপকাঠি তৈরি করেছে। তার মানে, আমাদের এনভায়রনমেন্টাল কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, কে দূষণের মাত্রা পরিমাপ ও বিশ্লেষণ করবে? নদী কমিশন এ ব্যাপারে কী ভাবছে, তা জানা নেই। এ কাজ নিজেরা হাতে নিতে পারেন। অন্যথায় যারা নিয়মিত দূষণের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করেন, তাদেরকে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সঙ্গে নিতে পারেন। নদী কমিশনের আরেকটি বড় দায়িত্ব হচ্ছে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা। এ কাজের মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশাবলি রয়েছে। এ নির্দেশাবলি পালন দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসন কতটুকু সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে, সে ব্যাপারে আলোচনা সভার বিভিন্ন বক্তা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কমিশন যদি এই দায়িত্ব পেতে সক্রিয় হন, তাহলে তাদের অনেক গবেষণাধর্মী কাজও করতে হবে। প্রথমত, নদীর ভৌত অবয়ব নিয়ে একটি সিদ্ধান্তে পেঁৗছতে হবে। নদীর সংজ্ঞা তৈরি করতে হবে। শীতকালে শীর্ণ নদীটিকে কোনোমতেই নদীর স্বাভাবিক আকার হিসেবে নেওয়া যাবে না। আবার আমাদের মতো দেশের যেখানে নদী বর্ষায় দূকুল ছাপিয়ে তীরবর্তী প্লাবনভূমি ডুবিয়ে ফেলে, সেই পুরো ব্যাপ্তিকেও নদী বলা যাবে না। নদীর পাড় যেখানে সুস্পষ্ট, সেখানে নদী চিহ্নিত করা সহজ। অন্য জায়গার জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে নদী চিহ্নিত করতে হবে। আলোচনা সভায় প্রস্তাব করা হয়েছে, নদীর সীমানা সঠিক প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত ও পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন উপগ্রহের মাধ্যমে গৃহীত আলোকচিত্র উপযোগী হবে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের আরেকটি দায়িত্ব হচ্ছে নদীগুলোকে নৌ পরিবহনযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা। একই সঙ্গে আরও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে। দেশের উত্তরাঞ্চলে এমনকি মধ্যাঞ্চলেও, যেখানে জোয়ার-ভাটার প্রভাব নেই, সেখানে নদীকে নাব্য রাখার প্রধান অন্তরায় কৃষি সেচের জন্য পানি প্রত্যাহার। এ ক্ষেত্রে দেশের ভেতরের পাশাপাশি সীমানার বাইরের প্রতিবেশী দেশগুলোর কর্মকাণ্ডও বিবেচ্য। আলোচনা সভায় অভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আলোচনা হয় এবং অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার কথা বলা হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে বহু বছর ধরে সপক্ষে বলে আসছি। একইভাবে সেচ কাজের সঙ্গে নৌ পরিবহন এবং মাছের চারণক্ষেত্র তথা প্রজনন প্রক্রিয়া বহুলাংশে সাংঘর্ষিক, মনে রাখতে হবে। অর্থাৎ নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে নদীর পানির বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারের মধ্যে সমন্বয় আনা প্রয়োজন, মনে রাখতে হবে। আলোচনা সভায় নদী সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলার তাগিদ দেওয়া হয়। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তারা তাদের ওয়েবসাইটের সঙ্গে উপাত্ত সংগ্রহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের সংযোগ স্থাপন করে কাজটি করবেন। কমিশনের কার্যাবলির ১২ (ঠ) উপধারার বিষয়ে আমার যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। এই উপধারায় বলা হয়েছে- নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট বিদ্যমান বিভিন্ন আইন ও নীতিমালার ব্যবহারিক পর্যালোচনাক্রমে ও প্রয়োজনবোধে উক্ত আইন ও নীতিমালা সংশোধনকল্পে সরকারকে সুপারিশ প্রদান করবে। আমি সুযোগ পেলেই বলে থাকি, বাংলাদেশের বিভিন্ন আইন মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক, বিষয়কেন্দ্রিক নয়। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারও অনেক প্রতিফলন পাওয়া যাবে বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩ কিংবা ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে। লক্ষণীয়, নদী রক্ষা কমিশন আইন এবং বাংলাদেশ পানি আইন একই বছর যথাক্রমে জুলাই ও ডিসেম্বর মাসে। নদী রক্ষা কমিশন আইন ওই বছরের ১৪ নম্বর আইন এবং বাংলাদেশ পানি আইন ওই বছরের ২৯ নম্বর আইন। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন যেমন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে, তেমনই জাতীয় পানি আইনের মাধ্যমে যে ওয়ারপো (পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা) নামের সংস্থাটিকে কার্যকর করা হয়েছে, সেটা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে। আমরা দেখছি, নদী রক্ষা কমিশন ও ওয়ারপোর কার্যক্রম বহুলাংশে পুনরাবৃত্তিমূলক। দুটি আইনেই মেনে নেওয়া হয়েছে যে পানির ব্যবহার বহুমাত্রিক। আমি অনেকবারই বলেছি, পানিসম্পদ বা নদী নিয়ে কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় দ্বন্দ্ব নিরসন কিংবা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে আন্তঃমন্ত্রণালয় সাযুজ্য আনা জরুরি। কিন্তু বিষয়টি অত্যন্ত জটিল ও সাংঘর্ষিক, সেটাও স্বীকার করতেই হবে। নদী রক্ষা কমিশনকে ওয়ারপোর সঙ্গে সমন্বয় করা ছাড়াও মনে রাখতে হবে তাদের কাজের সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, শিল্প, যোগাযোগ, ভূমি, পররাষ্ট্র প্রভৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে। আমরা জানি, পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়েও একটি কমিটি রয়েছে, যার সভাপতিত্ব করে থাকেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আবার নদী রক্ষা কমিশনের কাজ তদারকির দায়িত্ব জাতীয় সংসদের। বিষয়টি ভাবনার। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাজের মধ্যে সমন্বয় করা এমনিতেই জটিল; আর তদারকি কর্তৃপক্ষও যদি ভিন্ন হয়, তাহলে তো জটিলতর। শেষ কথা হচ্ছে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কেবল তাদের কাজ শুরু করেছে বলা চলে। তাদের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করার সময় এখনও আসেনি। অন্যদিকে সমগ্র দেশবাসী তাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে যে তারা সাফল্যের সঙ্গে দেশের নদ-নদীকে কেবল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা নয়; সজীব ও সচল করেও তুলবেন। এই প্রেক্ষাপটে নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার জটিল জগতে তাদের স্বাগত ও শুভ কামনা জানাই। কেবল হাঁটি হাঁটি পা প্রতিষ্ঠানটি সামনের দিনগুলোতে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে এগিয়ে যাবে- এটাই প্রত্যাশা।

    1. ড. আইনুন নিশাত পরিবেশ বিশেষজ্ঞ; ইমেরিটাস অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

    একটি উত্তর ত্যাগ

    আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
    এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে