বাগ-ই-বাদশাহী থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

2
95
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছ কাটার প্রতিবাদে মানববন্ধন। ছবি: রিংকু চন্দ্র

ইতিহাস বলে মোগল আমলে রমনা গ্রিন এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একীভূত ছিল। তখন এর নাম ছিল বাগ-ই-বাদশাহী। যার স্রষ্টা ছিলেন মোগল রাজন্যবর্গরা।

ব্রিটিশরা এসে দুই উদ্যানের মাঝখানে একটি সড়ক নির্মাণ করে এবং এটিকে বিভক্ত করে। ওইপাশের নাম দেয়া হয় রমনা গ্রিন। এপাশের বাগান কেটে নির্মাণ করা হয় রেসকোর্স ময়দান। যেখানে শতবছরব্যাপি ঘোড়দৌড়ের মধ্যদিয়ে জুয়া খেলার সাপ্তাহিক আসর বসতো।

স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানকার জুয়া খেলা নিষিদ্ধ করেন এবং এর নামকরণ করেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। জাতীয় বৃক্ষ রোপণ দিবস উপলক্ষে ১৯৭৩ সালের ১ জুন উদ্যানের টিএসসি সংলগ্ন প্রবেশ পথে নিজ হাতে দুটি নারকেল গাছ রোপণ করেন তিনি।

এসময় একজন আমলা মন্তব্য করেছিলেন– স্যার এসব নারকেল তো পাবলিক খেয়ে ফেলবে। বঙ্গবন্ধু মন্তব্য করেছিলেন, ‘জনগণের জিনিস জনগণ খাবে। তাতে তোমার সমস্যা কোথায়?’

একথায় ওই আমলা খুব লজ্জা পেয়েছিলেন। বিষয়টি তখনকার পত্র-পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছিল। এরপর বঙ্গবন্ধু কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন উদ্যানের চারদিকে বৃত্তাকারে নারকেল গাছ লাগানোর জন্য।

অতীতের কথা বাদ দিলাম। পাকিস্তান সৃষ্টির পর জিন্নাহ এই ময়দানে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন–দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু। তখনকার ছাত্রসমাজ তার এই ঘোষণায় তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল।

১৯৬৯ সালের ২২ জানুয়ারি তখনকার ছাত্রসমাজ গণমানুষের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রকাশ্য জনসভায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধীতে ভূষিত করেছিল।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এই উদ্যানে দাঁড়িয়েই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। যা আজ সারা বিশ্বের সেরা ভাষণ হিসাবে ইউনেস্কো স্বীকৃত।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর পূর্বান্চলের কমান্ডার আমির মোহাম্মদ নিয়াজী সেনাদের নিয়ে যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন এই উদ্যানে।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত বঙ্গবন্ধু লন্ডন-দিল্লি হয়ে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি এই উদ্যানে এসে কান্নাজড়িত কন্ঠে তাঁর ভাষণ দিয়েছিলেন।

১৯৭৩ সালের জানুয়ারি মাসে এই উদ্যানে দাঁড়িয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। এবং বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে পরের মাসেই তাঁর সেনাবাহিনীকে স্বদেশে ফেরত নিয়েছিলেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর এবং বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যাকে ঘিরে ‘সোনার বাংলা বলয়’ নির্মাণ করার কথা ঘোষণা দেন।

সে অনুযায়ী কাজ চলছে আজ প্রায় ২৪ বছর ধরে। যেখানে ছয় বছরে পদ্মাসেতুর মতো একটি জটিল নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ হতে চললো— সেক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে নিয়ে আমলাদের এসব ছিনিমিনি খেলার মানে কি?

২৪ বছরেও এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি কেন? এখন কার স্বার্থে একটি জাতীয় উদ্যানের প্রায় ৫০ বছর বয়সী গাছ কেটে একটি নয় দুটি নয়, সাতটি রেস্তোরাঁ নির্মাণ করা হচ্ছে? পৃথিবীর কোনো জাতীয় উদ্যানে কি রেস্তোরাঁ আছে?

আমি একজন প্রকৃতিপ্রেমী এবং সংস্কৃতিকর্মী হিসাবে এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আশা করি, সংশ্লিষ্টদের এবার বোধহয় হবে।

তা না হলে এই অপরিণামদর্শীতার জন্য এক সময় স্ফূলিঙ্গ জ্বলবে।

লেখা: আনোয়ার ফরিদী

2 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে