করোনা মহামারির পর প্রথম অস্কার

0
12

করোনা মহামারির পর প্রথম অস্কারের বাকি আর কয়েক ঘণ্টা। বহু বছর পর এবারের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের সামনেরর সারির শাখাগুলোতে দেখা যেতে পারে অনেক চমক।

চীনা বংশোদ্ভুত আমেরিকান নারী নির্মাতা ক্লোয়ি জাও পরিচালিত ‘নোম্যাডল্যান্ড’ সামনের সারির দুই পুরস্কার সেরা চলচ্চিত্র ও সেরা পরিচালক শাখায় শেষ হাসি হাসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০১৭ সালে প্রকাশিত সাংবাদিক জেসিকা ব্রুডারের ‘নোম্যাডল্যান্ড’ গ্রন্থ অবলম্বনে ছবিটি তৈরি হয়েছে। এতে রয়েছে ষাটোর্ধ্ব বিধবা ফার্নের গল্প। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন আমেরিকান তারকা ফ্রান্সেস ম্যাকডরম্যান্ড। কাহিনিতে ২০০৮ সালের আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। সেই সময় যাযাবর জীবন কাটান তিনি। নিজের ভ্যানকে ভ্রাম্যমাণ বাড়িতে রূপ দিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ান। আয়ের জন্য জুটিয়ে নেন মৌসুমি চাকরি। অন্য যাযাবরদের সঙ্গে আড্ডা দেন। পেশাদার অভিনয়শিল্পীদের পরিবর্তে সত্যিকারের যাযাবরেরা অভিনয় করেছেন সার্চলাইট পিকচার্সের ছবিটিতে।

‘নোম্যাডল্যান্ড’ এ বছরের বেশিরভাগ পুরস্কার জেতার ফলে অস্কারজয়ের সম্ভাবনা প্রবল। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই মূলত অস্কারের দৌড় শুরু করেছিল এটি। তখন ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণসিংহ ও টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড জিতে আগেভাগে সবার প্রিয় হয়ে ওঠে এই ছবি। এরপর গোল্ডেন গ্লোবস, বাফটা, ক্রিটিকস চয়েস ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্পিরিট অ্যাওয়ার্ডসে সেরা চলচ্চিত্র ও সেরা পরিচালক; ডিরেক্টরস গিল্ড অব আমেরিকা অ্যাওয়ার্ডসে সেরা পরিচালক, প্রডিউচার্স গিল্ড অব আমেরিকা অ্যাওয়ার্ডসে সেরা হয়েছে এটি।

সেরা পরিচালক শাখায় অস্কার জিতে ইতিহাস গড়তে পারেন ক্লোয়ি জাও। ক্যাথরিন বিগেলো একমাত্র নারী নির্মাতা যিনি এই পুরস্কার জিতেছেন। ২০১০ সালে ‘দ্য হার্ট লকার’ তাকে এই সম্মান এনে দেয়। সেরা পরিচালক শাখায় ক্লোয়ি জাওয়ের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিটিশ নির্মাতা এমারেল্ড ফেনেল (প্রমিসিং ইয়াং ওম্যান)। তাদের সুবাদে প্রথমবারের মতো অস্কারের সেরা পরিচালকের দৌড়ে আছে দুই নারীর নাম। এবারের মনোনয়ন তালিকায় জায়গা পাওয়া রেকর্ডসংখ্যক ৭৬ জন নারীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তারাই। এছাড়া মনোনীত ২০ অভিনয়শিল্পীর মধ্যে ৯ জন অশ্বেতাঙ্গ। সেরা পরিচালক শাখায় অন্য মনোনীতরা হলেন টমাস ভিন্টারবার্গ (অ্যানাদার রাউন্ড), ডেভিড ফিঞ্চার (ম্যাঙ্ক) এবং লি আইজ্যাক চাঙ (মিনারি)।

এদিকে সেরা চলচ্চিত্র শাখায় এতই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে যে, এই পুরস্কার নিয়ে বাজি ধরা এবার বেশ কঠিন। কোরিয়ান অভিবাসী পরিবারের গল্প ‘মিনারি’ চমকে দিতে পারে।

১৯৩০ সালের প্রেক্ষাপটে নির্মিত নেটফ্লিক্সের ‘ম্যাঙ্ক’ ৯৩তম অস্কারে সর্বাধিক ১০টি শাখায় মনোনয়ন পেলেও সেরা চলচ্চিত্রসহ সামনের সারির কোনো পুরস্কারসহ জেতার সম্ভাবনা খুবই কম। হলিউডের ধ্রুপদী ছবি ‘সিটিজেন কেইন’-এর (১৯৪১) অস্কারজয়ী চিত্রনাট্যকার হারম্যান জে. ম্যাঙ্কিয়েভিচের সাদাকালো বায়োপিক এটি। তার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন গ্যারি ওল্ডম্যান। তিন বছর আগে অস্কারে সের অভিনেতা হন তিনি। শিল্প নির্দেশনার মতো কারিগরি শাখাতেই কেবল পুরস্কৃত হতে পারে ছবিটি।

সেরা চলচ্চিত্র শাখায় নেটফ্লিক্সের আরেকটি ছবি আছে (দ্য ট্রায়াল অব দ্য শিকাগো সেভেন)। ষাটের দশকের প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী একদল মানুষের সত্যি কাহিনিতে সাজানো এই ছবিও সর্বোচ্চ সম্মান জিতবে বলে মনে হয় না। ফলে এবারও সেরা চলচ্চিত্র শাখায় নেটফ্লিক্সের অস্কার খরা কাটবে কিনা তা নিয়ে বাজি ধরার লোক কম। যদিও সব মিলিয়ে এবার ৩৫টি মনোনয়ন জড়ো করেছে নেটফ্লিক্স।

সেরা চলচ্চিত্র শাখায় আরও আছে ষাটের দশকে কৃষ্ণাঙ্গদের রাজনৈতিক দল ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টির গল্প ‘জুডাস অ্যান্ড দ্য ব্ল্যাক মেসায়া’, বধির রক ড্রামারকে ঘিরে ‘সাউন্ড অব মেটাল’, মিটু হ্যাশট্যাগে অনুপ্রাণিত প্রতিশোধের আখ্যান ‘প্রমিসিং ইয়াং ওম্যান’ এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া এক বৃদ্ধকে ঘিরে ‘দ্য ফাদার’।

সেরা অভিনেতা

সামনের সারির পুরস্কারগুলো “মা রেইনি’স ব্ল্যাক বটম” ছবির জেতার সম্ভাবনাও ব্যাপক। এতে ১৯২৭ সালের বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর ভূমিকায় অনবদ্য নৈপুণ্যের সুবাদে সেরা অভিনেতা শাখায় পুরস্কৃত হতে পারেন প্রয়াত চ্যাডউইক বোজম্যান। গোল্ডেন গ্লোবস, স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড ও ক্রিটিকস চয়েস অ্যাওয়ার্ডস জিতেছেন তিনি। গত বছর ক্যান্সারে তার অকাল মৃত্যু হয়। সেরা অভিনেতা শাখায় দ্বিতীয় তারকা হিসেবে মরণোত্তর অস্কার জিততে পারেন তিনি। ১৯৭৬ সালে সিডনি লুমেটের ‘নেটওয়ার্ক’-এর জন্য প্রয়াত পিটার ফিঞ্চ এই স্বীকৃতি পান মরণের পর।

তবে বাফটা পেয়ে স্যার অ্যান্থনি হপকিন্স (দ্য ফাদার) এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্পিরিট অ্যাওয়ার্ড জিতে রিজ আহমেদ (সাউন্ড অব মেটাল) সম্ভাবনা ধরে রেখেছেন। তাদের মধ্যে রিজ আহমেদের এটি প্রথম অস্কার মনোনয়ন। তার সুবাদে প্রথম কোনো মুসলিম তারকা সেরা অভিনেতা শাখায় মনোনীত হলেন। স্যার অ্যান্থনি হপকিন্স ষষ্ঠবার অস্কারে মনোনীত হলেন। সবচেয়ে বেশি বয়সে সেরা অভিনেতা মনোনয়ন পাওয়ার রেকর্ড গড়েছেন ৮৩ বছর বয়সী এই ওয়েলশ তারকা।

ইয়া-জাং উনের সহশিল্পী স্টিভেন ইয়ান সেরা অভিনেতা শাখায় এবং লি আইজ্যাক চাঙ মনোনীত হয়েছেন সেরা পরিচালক হিসেবে। কোরিয়ান বংশোদ্ভুত আমেরিকান নাগরিক। ‘মিনারি’তে তুলে ধরা হয়েছে কোরিয়ান অভিবাসী একটি পরিবারের হৃদয়ছোঁয়া গল্প, যারা আশির দশকে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়ে কৃষি খামার গড়ার চেষ্টা করে।

সেরা অভিনেত্রী

অস্কারের এই শাখায় অন্যান্যবারের চেয়ে এবার দারুণ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে। তাই এ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা হবে বোকামি! সেরা পাঁচ অভিনেত্রীর চারজনই এবারের মৌসুমে কমপক্ষে একটি করে বড় পুরস্কার জিতেছেন। গোল্ডেন গ্লোবসে অ্যান্ড্রা ডে (দ্য ইউনাইটেড স্টেটস ভার্সেস বিলি হলিডে), স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ডে ভায়োলা ডেভিস (মা রেইনি’স ব্ল্যাক বটম), ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্পিরিট এবং ক্রিটিকস চয়েস অ্যাওয়ার্ডে ক্যারি মালিগ্যান (প্রমিসিং ইয়াং ওম্যান), বাফটায় ফ্রান্সেস ম্যাকডরম্যান্ড (নোম্যাডল্যান্ড) সেরা হয়েছেন। অন্য মনোনীত অভিনেত্রী ভানেসা কার্বি (পিসেস অব অ্যা ওম্যান) ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রী হয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরে এমা স্টোন ও অলিভিয়া কোলম্যান ভেনিসে সেরা হওয়ার পর অস্কারে শেষ হাসি হেসেছেন। তাই তাকেও বাদ দেওয়া যাচ্ছে না।

সেরা পার্শ্ব অভিনেতা

ড্যানিয়েল কালুইয়া সেরা পার্শ্ব অভিনেতা শাখায় সবচেয়ে ফেবারিট। ‘জুডাস অ্যান্ড দ্য ব্ল্যাক মেসায়া’য় ষাটের দশকে কৃষ্ণাঙ্গদের রাজনৈতিক দল ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টির চেয়ারম্যান ফ্রেড হ্যাম্পটনের ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেছেন তিনি। বাফটা, গোল্ডেন গ্লোব, স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড ও ক্রিটিকস চয়েস অ্যাওয়ার্ডস জিতে অস্কারজয়ের দৌড়ে অনেক এগিয়ে এই ব্রিটিশ তারকা।

ফলে সাশা ব্যারন কোহেন (দ্য ট্রায়াল অব দ্য শিকাগো সেভেন), লেজলি ওডোম জুনিয়র (ওয়ান নাইট ইন মায়ামি), পল রাসি (সাউন্ড অব মেটাল) এবং ড্যানিয়েল কালুইয়ার সহশিল্পী লাকিথ স্ট্যানফিল্ড (জুডাস অ্যান্ড দ্য ব্ল্যাক মেসায়া) খালি হাতে ফিরছেন তা মোটামুটি অবধারিত।

সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী

‘মিনারি’ তারকা ইয়া-জাং উনের মাধ্যমে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের সংক্ষিপ্ত তালিকায় দক্ষিণ কোরিয়ান কোনো অভিনেত্রীর নাম উঠলো। ৭৩ বছর বয়সী এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী পুরস্কারটি নিয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বাফটা, স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্পিরিট অ্যাওয়ার্ডস জিতে এগিয়ে আছেন তিনি।

তবে ‘ম্যাঙ্ক’ ছবির জন্য আমান্ডা সাইফ্রায়েড এবং ‘বোরাট সাবসিকোয়েন্ট মুভিফিল্ম’ ছবির জন্য বুলগেরিয়ার মারিয়া বাকালোভাকে সম্ভাবনাময় মনে করা হচ্ছে। সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী শাখায় মনোনীত অন্য দুজন হলেন গ্লেন ক্লোজ (হিলবিলি এলিজি) এবং অলিভিয়া কোলম্যান (দ্য ফাদার)।

সেরা অ্যানিমেটেড শাখায় ‘সৌল’ এবং সেরা আন্তর্জাতিক কাহিনিচিত্র শাখায় ‘অ্যানাদার রাউন্ড’ নিরঙ্কুশ ফেবারিট। অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের ৯ হাজার সদস্যের ভোটে বিজয়ীরা নির্বাচিত হচ্ছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে