শব্দ কল্প চিত্রে ‘স্বাধীনতা ও ইত্তেফাক’

    0
    596

    স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা, বাংলাদেশের জন্ম থেকে আজকের বাংলাদেশ—ইত্তেফাক এর পথচলার খণ্ড খণ্ড চিত্র। জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী মিলনায়তনে উঠে এসেছে ইত্তেফাকের ৬৩ বছরের গতিধারা। উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা। ইত্তেফাকের ৬৪ বছরে পদার্পন উপলক্ষে ‘স্বাধীনতা ও ইত্তেফাক’ কে উপজীব্য ধরে ‘শব্দ কল্প চিত্র’ শীর্ষক তিন দিনের স্থাপনাশিল্প প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের সাক্ষি এই সংবাদপত্রের প্রতিটি পদক্ষেপে ভাবনায় যে মানুষ ও দেশ মিশে রয়েছে তাই ফুটে উঠেছে তরুণশিল্পীদের উপস্থাপনায়।

    সংবাদপত্রের পাতাকে অবলম্বন করে শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলেছেন ইত্তেফাকের ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ। ফুটে উঠেছে ঐতিহাসিক সব হেডিং। সেসব হেডিং-এ মিশে রয়েছে দেশের একেকটি ইতিহাস। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং সবশেষে স্বাধীনতা। আর এ সবকিছুর পেছনে বাতিঘরের মতো জ্বলছেন ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া।

    বিকালে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। সম্মানিত অতিথি ছিলেন বরেণ্য শিল্পী হাশেম খান। সভাপতিত্ব করেন ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন নারীনেত্রী ও জাসদ একাংশের সাধারন সম্পাদক শিরীন আকতার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মানিক মিয়ার কনিষ্ঠপুত্র পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত, বার্তা সম্পাদক মলয় পাঁড়ে, সিটি এডিটর আবুল খায়ের ও আইন-বিচার ও নির্বাচন কমিশন বিষয়ক সম্পাদক সালেহউদ্দিন।

    তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম থেকে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’কে আলাদা করা যাবে না। পত্রিকাটি আমাদের স্বাধীনতার সঙ্গী হয়ে আছে। তিনি বলেন, যে কোন সংগ্রামের জন্য অসি ও মসি দু-ই দরকার হয়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অসি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর মসি ছিলেন ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। শুধু মুক্তিযুদ্ধেই নয় স্বাধীন বাংলাদেশেও অদ্যাবধি স্বশাসনের আন্দোলন, বাংলা ভাষা ও বাঙালী সংস্কৃতি চর্চায় ইত্তেফাক ভূমিকা রেখে চলেছে।

    সাংবাদিকরা যে মতাদর্শেরই হোক না কেন, তাদের নীতি ও নৈতিকতা থাকতে হয় উল্লেখ করে ইনু বলেন, দেশের স্বাধীকার আন্দোলনে মানিক মিয়া তার নীতি ও নৈতিকতা নিয়ে দেশ ও জাতির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। এ জন্য পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী প্রথমেই তার পত্রিকা ইত্তেফাক ও এর অফিস পুড়িয়ে দেয়।

    তিনি বলেন, সেদিন পাকিস্তানিরা শুধু ইত্তেফাককে নয়, সেই সাথে বাংলাদেশকেও পুড়িয়ে দিয়েছিল। তবে সেদিন তারা মানিক মিয়ার তেজদীপ্ত সাহসকে, তার নীতিকে, তার নৈতিকতাকে পুড়িয়ে দিতে পারেনি। ইত্তেফাক তার নীতি- নৈতিকতা বজায় রেখে আজও এগিয়ে চলেছে বলে তথ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

    তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু আরও বলেন, পাকিস্তানিরা ইত্তেফাক ভবনে আগুন দিয়ে পুঁড়িয়ে জাতীয় আত্মাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু আগুন দিয়ে স্বাধীনতা, আত্মা ও নীতিকে পোড়ানো যায় না। তেমনি আজও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেশের অগ্রগতিকে হত্যা করে কেউ ক্ষমতায় যেতে পারবে না। ইনু আরও বলেন আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি, ইত্তেফাক আমার মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করেছে।

    শিল্পী হাশেম খান বলেন, ইত্তেফাকের মাধ্যমে এমন অভিনব প্রদশর্নী প্রসংশার দাবিদার। ইত্তেফাক শুরু থেকে আজ অবধি অসাম্প্রদায়িকতাকে লালন করে চলেছে। তিনি বলেন ১৯৫৬ সাল থেকে ইত্তেফাক প্রগতিশীলতার সাথে সকল আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। এরই ধারাবাহিতকার দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গী হয়েছে ইত্তেফাক। এই ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি জাদুঘরে এর সংরক্ষনের সুপারিশ করেন।

    তাসমিমা হোসেন প্রদর্শনীর সাফল্য কামনা করে বলেন, ইত্তেফাক কীভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে তা নতুন প্রজন্ম এই প্রদশর্নীর মাধ্যমে জানতে পারবে। তিনি বলেন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধীকার আন্দোলনের যে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে তার সাথে ইত্তেফাক ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল। দৈনিক ইত্তেফাক মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই অর্জনকে অবলম্বন করেই সামনে এগিয়ে যাবে।

    জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিরিন আক্তার সংবাদপত্র এমন একটি প্রদর্শনী আয়োজন করতে পারে তা আমার ধারনায় ছিল না বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের একটি অংশ ইত্তেফাক।

    তরুণশিল্পীরা ইত্তেফাকের দীর্ঘ প্রকাশনাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে চেয়েছেন। একদিকে দেশের রাজনিতিক আন্দোলন অপরদিকে সে আন্দোলনে সংবাদপত্রের ভূমিকা। এসব বিষয়কে ভাবনায় রেখে ১৩টি স্থাপনাশিল্পে বেশ কয়েকটি পর্বে শিল্পীরা তুলে ধরেছেন তাদের শিল্প-ভাবনা। ‘ভ্রুণ’, ‘অপরাজেয়’, ‘রাজারবাগের সংবাদ’, ‘পদক্ষেপ’, ‘‘চরমপত্র (একাত্তরের অস্ত্রহীন যুদ্ধ)’, ‘ক্ষুদে বার্তা’, ‘পটচিত্র’, ‘বিনোদিনী’, ‘সংবাদের রাজ্য’, ‘সম্পাদকের কক্ষ’ ও ‘আদর্শলিপি’। এসব পর্বে তারা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন বিভিন্ন পর্ব এবং ইত্তেফাকের ভূমিকার কথা। প্রদর্শনীর কিউরেটর ছিলেন শিল্পী অভিজিত্ চৌধুরী। তার সঙ্গে ছিলেন তরুণশিল্পীদের একটি দল। এরা হলেন- এস এম এহ্সান, জয়ন্ত সরকার জন, এ জেড শিমুল, কপিল চন্দ্র রায়, মোঃ নোমান, চারুলতা, আশরাফুল ইসলাম শাওন, আশীষ আচার্য্য, মাধবী সুলতানা, শুভ্র তালুকদার, কৃষ্ণ কমল ভৌমিক ও আল নোমান হীরা।

    এদিকে, পুরো মিলনায়তন ঢেকে রয়েছে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত বিখ্যাত সব হেডিং-এ। ৬৩ বছরের পথচলাকে শিল্পী কপিল চন্দ্র রায় রাজনৈতিক কালপর্ব হিসেবে ভাগ করেছেন। রাজনৈতিতভাবে যেমন দেশ একেকটি পদক্ষেপ পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। সংবাদপত্র হিসেবে ইত্তেফাকও তেমনি শত বাধা পেরিয়ে স্বাধীন চিন্তা নিয়ে পথ অত্রিক্রম করে চলেছে। এই উপস্থাপনার নাম ‘পদক্ষেপ’। জয়ন্ত সরকার জন তার ‘অপরাজেয়’ উপস্থাপনায় তুলে ধরেছেন প্রতিদিনের সংবাদের গুরুত্বকে। অভিশ্বাস্য, নৃশংস সব সংবাদ প্রকাশ পায় প্রতিদিন। আবার এসবের মাঝেই প্রকাশিত হয় আনন্দের ঘটনার বিবরণ। মানুষের জীবন এমনই ভাল মন্দে মিশিয়ে। সেই অর্থে সংবাদপত্র জীবনের প্রতিরূপ। কৃষ্ণ কমল ভৌমিক ‘সম্পাদকের কক্ষ’ তে মানিক মিয়াকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। টেবিলে একটি কলম, পেপারওয়েট, নিচে তার জুতো জোড়া। কিন্তু টেবিলের ওপরে গতকাল প্রকাশিত ইত্তেফাক। শিল্পী যেন বোঝাতে চাইছেন তিনি নেই। কিন্তু ইত্তেফাকের অস্তিত্বজুড়ে মানিক মিয়া। আজকের পত্রিকার প্রকাশনার পেচনে প্রেরণা হিসেবে মানিক মিয়া রয়েছেন, থাকবেন চিরকাল।

    প্রদর্শনী চলবে শনিবার পর্যন্ত। আজ শুক্রবার বিকাল তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত প্রদর্শনী উন্মুক্ত থাকবে। আর আগামীকাল শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত প্রদর্শনী চলবে।

    একটি উত্তর ত্যাগ

    আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
    এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে