গড়াই নদীর আরেক নাম গৌরী নদী : সুমন শামস

0
2100

২৬ মার্চ ২০১৯, মঙ্গলবার, (নোঙরনিউজ) : গৌরী নদীর নাম শুনেছি অনেক। এবার চোখ মেলে দেখবো বলে গত ১৫ আক্টোবর ২০১৮, সোমবার রাত ১২টায় ঢাকার গাবতলী থেকে শুরু হয় ছেউড়িয়ার যাত্রা। বাসষ্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি শতশত তীর্থযত্রী লালন শাহ্’র দরবারে যাবার জন্য অপেক্ষা করছেন। সরাসরি কোন বাহণ না পাওয়ার কারণে একটি লোকাল বাস আরিচা প্মা নদীর ঘাট পর্যন্ত যেতে রাজী হলে দুই বাস তীর্থযাত্রীদের নিয়ে ১০০ টাকা করে ভাড়ার চুক্তিতে উঠে পড়ি লোকাল বাসে।

সহযাত্রী ছিলো বন্ধু জীবন আহসান, সরকার সজীব, বিটিভি প্রযোজক নাসির ইদ্দীন, ক্যামেরা পার্সন আনোয়ার হোসেন ছিলেন আমার প্রামাণ্যচিত্র গবেষণার সহকর্মী। রাত ২টার সময় আমরা পাটুরিয়া ফেরী ঘাটে চলে যাই। আব্দুর রহিম খা মানিকগঞ্জের উপজেলা চেয়ারম্যান অনেক প্রভাবশালী। তিনি আরিচা ঘাটের সকল ইজারা নিয়ে বাণিজ্য করছেন অনেক বছর থেকে। ঘাট তার লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে প্রতিটি যাত্রী অথবা তীর্থযাত্রীদের কাছ থেকে এক ধরণের গুন্ডামি আচরণ দেখিয়ে টাকার হিসেব মিলায়ে যাচ্ছেন নির্ভয়ে।

ফেরীতে উঠে রাতের পদ্মার দৃশ্য উপভোগ করতে করতে এক ঘন্টার মধ্যে দৌলতদিয়া ঘাটে পৌছে যায়। ওপাড়ে নামতেই শুনি রাত ৩:০০টায় দৌলতদিয়া ফেরী ঘাটে এক মর্মান্তিক দূর্ঘটনা ঘটে গেল। পাটুরিয়া ৩নং ফেরী ঘাটের ইজারাদার রহিম খানের কিছু গুণডা বাহিনীর তৎপরতা দেখে ফেরীতে উঠলাম আমাদের দল নিয়ে। ফেরীটি দৌলতদিয়া ঘাটে নামতেই এক মায়ের ৪ বছরের কন্যা সন্তান রুকাইয়াকে পদ্মা নদীর প্রবল স্রোতে হারিয়ে কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিচ্ছেন। জানতে চাইলে কান্নারত মা জানাচ্ছেন যে, এতক্ষণ হয়ে গেলো আমার মেয়েকে কেউ খুজে দিলো না। বলতে বলতে কান্নায় পাগল প্রায়।

নিখোঁজ রুকাইয়ার বাবা জনাব জনাব সেলিম রেজা বলেন, তিনি পরিবার নিয়ে কুমারখালী থেকে ঢকার উদ্দেশ্যে রোয়ানা হয়ে একটু আগে দৌলতদিয়া ফেরী ঘাটে পৌছে ফেরীতে উঠেন। তখন ফেরীর বাথরুমে যাবার জন্য শিশুটিকে হাতে ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখন ফেরীতে উঠে পড়া দূরপাল্লার একটি এসি বাসের কমপ্রেসারের হাওয়া ছাড়ার বিকট শব্দে শিশুটি ভয় পেয়ে দৌড় দিলে পানির মধ্যে পড়ে যায়। এখনো তাকে খুঁজে পাচ্ছি না। ঘাটের কর্তব্যরত পুলিশ জনাব মাসুদ বলেন, আমাদের অফিসে খবর দেয়া হয়েছে। রাজবাড়ি থেকে এখানে আসতে দুই ঘন্টা সময় লাগবে। আমরা অপেক্ষারত আছি।

প্রশ্ন হচ্ছে আমরা আমাদের নৌপথের যাত্রীদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পারছি? বাংলাদেশের সকল নৌবন্দর ইজারাদারদের দিয়ে ঘাটে ঘাটে যাত্রীদের হয়রানি আর ভোগান্তি চরম পর্যায় পৌঁছে গেছে। যাত্রী সেবা না দিয়ে চলছে টাকার হিসেবে খুব উত্তেজিত থাকে রহিম খানের লাঠিয়াল বাহিনী! অথচ প্রত্যেকটি নৌবন্দরে থাকার কথা ছিল উদ্ধারকারী বাহিনী। যা এই দৌলতদিয়া ফেরীঘাটে খুব জরুরী। মেনর মধ্যে প্রশ্ন আসে, এ ভাবে আর কত মানুষ মৃত্যু বরণ করলে আমাদের ঘুৃম ভাংবে!

এক পর্যায় রাত ৩:৩০ মিনিটে কাফেলার দল দৌলতদিয়া রেল স্টেশনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ভোর সকালে কূয়াশার মধ্যে আমরা কুষ্টিয়াগামী রেলগাড়ীর অপেক্ষায় প্লাটফর্মে অপেক্ষা করি। তার পর দূরের কূয়াশা ভেদ করে ঝমঝম শব্দ করে হুইসেল বাজিয়ে একটি লোকাল ট্রেন এসে আমাদের সামনে এসে থেমে যায়। তাড়াহুরা করে আমাদের কাফেলার দল ট্রেনে উঠে পড়ি।ভোর সকালের ঘন কূয়াশার ভেতর দিয়ে সেই মেইল ট্রেন রাজবাড়ী হয়ে কুষ্টিয়ার দিকে ছুটে চলে।শতশত যাত্রীদের ভিড়ে অবস্থা খুব টাইট হয়ে গিয়ে ছিলো।

১৬ অক্টোবর ২০১৮, মঙ্গলবার দুপুর ১২টার মধ্যে আমাদের কুষ্টিয়া ষ্টেশনে নামিয়ে দেয় মেইল ট্রেন। ট্রেনের প্রায় সকল যাত্রী এখানেই নেমে পড়ে তার কারণ উদ্যেশ্য ছেউড়িয়ার লালন শাহের দরবারে যাওয়া। আর আমার উদ্যেশ্য ছিলো রথ দেখা এবং কলা বিক্রি যেনো একসাথেই হয়। লালন শাহের নদী অর্থা গৌরী নদীর অনুসন্ধান করা। তাই সকলের সাথে আমার পথ এক ছিলো না।শহরে নেমে একটু বিশ্রাম করে সহকর্মীদের নিয়ে বিশাল সাধুর বাজারে দিয়ে সাইজিকে দর্শন দিয়ে সন্ধ্যায় সোজা গড়াই/গৌরী নদীর পাড়ে চলে যাই। নদির পাড়ে হাজার হাজার লালন ভক্তবৃন্দ খোলা আকাশের নিচে লালন সাইয়ের গান গাইছে। প্রকৃতি তখন অন্য এক আদ্ধাত্মিক এক রূপ উন্মোচন করে।

আধ্যাত্মিক সাধক ফকির লালন শাহ্ ১৭৭৪ সালে অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার হারিশপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তরুন বয়সে ফকির লালন শাহ্ একবার তীর্থ ভ্রমনে বের হয়ে পথিমধ্যে গুটি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তখন তার সাথীরা তাকে মৃত ভেবে কালি নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়ে পরিত্যাগ করে যার যার গন্তব্যে চলে যায়।

কালিগঙ্গা নদীতে ভেসে আসা মুমূর্ষ লালনকে উদ্ধার করেন মলম শাহ্। মলম শাহ্ ও তার স্ত্রী মতিজান তাকে বাড়িতে নিয়ে সেবা দিয়ে সুস্ত করে তোলেন। এরপর সুস্থ হয়ে ফকির লালন শাহ্ তার কাছে দীক্ষিত হন এবং কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে স্ত্রী ও শিষ্য সহ বসবাস শুরু করেন।

ছেউড়িয়াতে তিনি দার্শনিক গায়ক সিরাজ সাঁইয়ের স্বাক্ষাতে আসেন এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হন। তা ছাড়া লালন সংসারী ছিলেন বলে জানা যায়।তার সামান্য কিছু জমি ও ঘর বাড়ি ছিল।

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শাসন আমলে এই এলাকায় রেল যোগাযোগের জন্য রেল লাই স্থাপন করার সময় ঐতিহাসিক কালি নদীর বুকে বাধ দিয়ে এই নদীকে হত্যা করা রয়েছে। বর্তমানে রেল লাইনের পাশে সড়ক পথ নির্মাণ করা হয়েছে। একি ভাবে শহরের ভেতরে কয়েক স্থানে নদীকে পুকুর বানিয়ে যাতায়াতের পথ তৈরী করেছে সময়ের সন্তানেরা।

এ তো লালন সাহের কথা বললাম। এবার বলছি গড়াই নদীর বর্তমান পরিস্থিতার কথা। পরদিন সকালে আবার সেই নদীর দৃশ্য ধারণ করার কাজে নদীর কাছে ছুটে যাই। এই নদীর জলে আগত সকল সাধু ভক্তবৃন্দ স্নান করে পবিত্র হয়। হতাস হবার মতো দৃশ্যের সুচনা হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। এক সময়ে প্রমত্যা গড়াই নদীতে এখন হাটু জল। পূর্ণাথীরা সেই হাটু জলের নদী পায়ে হেটে পার হয়ে ওপারে যাচ্ছে, কেউবা এক জায়গায় দাড়িয়ে নিচু হয়ে হাটু পানিতেই মাথা ডুবিয়ে স্নান করছে। আবার যেটুকে পানি আছে এই নদীতে সেই পানিতে একটি শাখা নদীর দিয়ে আগত হাহার হাজার মানুষের মলমূত্র নদীর জলে মিশছে ফলে নদীর পাড়ের বিশাল এলাকায় পূতিময় দুর্গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। …চলবে

গড়াই নদী গঙ্গা নদীর বাংলাদেশ অংশের প্রধান শাখা। একই নদী উজানে গড়াই এবং ভাটিতে মধুমতি নামে পরিচিত। একসময় গড়াই-মধুমতি নদী দিয়ে গঙ্গার প্রধান ধারা প্রবাহিত হতো, যদিও হুগলি-ভাগীরথী ছিল গঙ্গার আদি ধারা। কুষ্টিয়া জেলার উত্তরে হার্ডিঞ্জ সেতু-এর ১৯ কিলোমিটার ভাটিতে তালবাড়িয়া নামক স্থানে গড়াই নদী গঙ্গা থেকে উৎপন্ন হয়েছে। নদীটি কুষ্টিয়া জেলার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গণেশপুর নামক স্থানে ঝিনাইদহ জেলায় প্রবেশ করেছে। অতঃপর ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া সীমানা বরাবর প্রবাহিত হয়ে চাদর নামক গ্রাম দিয়ে রাজবাড়ী জেলায় প্রবেশ করেছে। এরপর ঝিনাইদহ-রাজবাড়ী, মাগুরা-রাজবাড়ী এবং মাগুরা-ফরিদপুর জেলার সীমানা বরাবর প্রবাহিত হয়ে মধুমতি নামে নড়াইল ও বাগেরহাট জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। মধুমতি পরবর্তী সময়ে পিরোজপুর জেলার মধ্য দিয়ে বলেশ্বর নামে প্রবাহিত হয়েছে এবং মোহনার কাছাকাছি হরিণঘাটা নাম ধারণ করে বঙ্গোপসাগর-এ পড়েছে।

গড়াই অত্যন্ত প্রাচীন একটি নদী। অতীতে এর নাম ছিল গৌরী। বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ টলেমি তদানীন্তন গঙ্গা প্রবাহের সাগর সঙ্গমে পাঁচটি মুখের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ‘কম্বরী খান’ নামক মুখটিই প্রকৃতপক্ষে গড়াই বলে কেউ কেউ মনে করেন। গড়াই-মধুমতি নদীর গতিপথ দীর্ঘ এবং বিস্তৃত। অধিকাংশ গতিপথেই নদীটি এঁকে বেঁকে প্রবাহিত। উৎপত্তিস্থল থেকে কামারখালী পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে নৌকা ও অন্যান্য ছোট নৌযান চলাচল করতে পারে, কিন্তু শুকনো মৌসুমে এ অংশ অনাব্য হয়ে পড়ে। কামারখালী থেকে নিম্নাংশ মোটামুটি নাব্য, প্রায় সারা বছর এখানে নৌপরিবহণ সম্ভব হয়। কামারখালীতে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ ৭,৯৩২ ঘন মিটার, তবে উৎসমুখ শুকিয়ে যাওয়ায় কোনো কোনো সময় প্রবাহ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। উৎসমুখ থেকে বড়দিয়া পর্যন্ত গড় প্রস্থ ৪৫০ মিটার। এর পর নদীটির বিস্তার ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং নিম্নাঞ্চলে গড়ে ৩ কিমি। নদীটির মোহনা থেকে কামারখালী পর্যন্ত অংশ জোয়ারভাটা দ্বারা প্রভাবিত। কুষ্টিয়া শহরের সন্নিকটে গড়াইয়ের মুখ শীতকালে বন্ধ: হয়ে যায়।

গড়াই নদী ভাঙন প্রবণ। এর প্রবল ভাঙনের ফলে কুষ্টিয়ার বিখ্যাত রেন-উইক কারখানা, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প অফিস এবং কুষ্টিয়া শহরের বাণিজ্যিক এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া কুমারখালী বন্দর এবং জানিপুর বাজারও নদীভাঙন-এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু গ্রোয়েন তৈরি করে উল্লিখিত শহর-বন্দরগুলি রক্ষার ব্যবস্থা করেছে।

চলার পথে গড়াই-মধুমতি বহু শাখা-প্রশাখার জন্ম দিয়েছে এবং অন্যান্য অনেক নদীর সংস্পর্শে এসেছে। কুমার, কালীগঙ্গা, ডাকুয়া, বুড়ি গড়াই প্রভৃতি গড়াইয়ের শাখা নদী। চন্দনা গড়াই-এর উপনদী। নবগঙ্গা, চিত্রা, কপোতাক্ষ, খুলনা-যমুনা, গলঘাসিয়া, এলেংখালী, আঠারোবাঁকী প্রভৃতি নদী কোনো না কোনো ভাবে গড়াই-মধুমতি নদীর সংস্পর্শে এসেছে।

গড়াই-মধুমতি বাংলাদেশের অন্যতম দীর্ঘ নদী। এর অববাহিকাও বিস্তীর্ণ। নদীটি কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী প্রভৃতি জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে এইসব এলাকার সেচ ও কৃষির উন্নতি এ নদীর উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কুমারখালি, জানিপুর, সেঁউরিয়া, গণেশপুর, কাতলাগাড়ী, খুলুমবাড়ী, লাংগলবন্দ, শচিলাপুর, নাকোল, লোহাগড়া, পাংশা, বালিয়াকান্দি, বোয়ালমারী, কাশিয়ানী, ভাটিয়াপাড়া, নাজিরপুর, পিরোজপুর, শরণখোলা, মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটা এবং মোরেলগঞ্জ প্রভৃতি গড়াই-মধুমতি নদীর তীরবর্তী উল্লেখযোগ্য স্থান।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে