নাবিকের সমুদ্র কথন (দ্বিতীয় পর্ব-২৬) : ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ মাহমুদ

0
521
captain Abdullah Mahmud. photo : shuman shams

৪ অক্টোবর, ২০১৮ : কাল সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ঘুম ভেঙেছিল পৌনে এগারোয়। অনেক চেষ্টায়ও আর ঘুম আসেনি। তাই ১২ তা বাজেই ব্রিজে চলে এসেছি, তার মানে মধ্যরাত থেকেই দিনের শুরু। সাড়ে বারোটায় সব প্রস্তুত, চিফ অফিসার কে ডাকা হয় নি, সেকেন্ড অফিসার লি কে পাঠালাম সামনে এংকর উঠাবার জন্য। ১২:৫০ এ নোঙর তুলে আমরা রওনা দিলাম। আমাদের আগে আরেকটি জাহাজ আছে, সেটি একটি কন্টেইনার জাহাজ, ওদের পাইলট ০৩:৩০ তে, ওরাও রওনা হয়েছে আমাদের আগে আগে। কন্টেইনার জাহাজগুলি আকার আকৃতিতে বড় হলেও তাদের ওজন কম, মানে ওজনে মাল পরিবহন করে কম, আর জাহাজগুলি তৈরি করা হয় দ্রুতগতি সম্পন্ন। সে ঢিমে তালে এগুচ্ছে কারণ তার পক্ষে হটাত এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। এদিকে ট্যাংকার জাহাজগুলি ধীরে ধীরে গতি বারে, কন্টেইনার জাহাজ গুলি যদি মোটর বাইকের মত হয়, আমরা হলাম ট্রাক। সে আমাকে এগুতেও দিচ্ছে না, আবার আমাকে সাইডও দিচ্ছে না, অনেকটা ঢাকার রাস্তার বাসগুলির মত। আমরা ও তার পিছু পিছু এগুচ্ছি, আর এতেই আমি হাতে যে ৪৫ মিনিট সময় রেখেছিলাম তা ব্যয় হয়ে গেল।

সামনের জাহাজ থেকে মাইল খানেক পিছনে থেকে থেকে এক সময় পাইলট উঠার জায়গায় পৌঁছে গেলাম তখন সময় সাড়ে তিনটা বাজে। পাইলট বোট আগে ওদের জাহাজে পাইলট উঠিয়ে দিয়ে চলে এলো আমাদের জাহাজে, এবং নির্ধারিত সময়ের আগে ০৩:৩৬ এ পাইলট উঠে গেল আমাদের জাহাজে আর আমরা রওনা হলাম বন্দরের উদ্দেশ্যে। দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিমি, কিন্তু পানি অগভীর, তাই যেতে হবে ধীর লয়ে প্রায় ৭ ঘণ্টা সময় নিয়ে। পাইলট সাহেব একজন প্রাক্তন ক্যাপ্টেন, ইংরেজি ছবিতে সি আই এ’র প্রাক্তন পোড় খাওয়া এজেন্ট দের যেভাবে দেখানো হয়, বয়স হয়ে গেছে কিন্তু এখনো ছিপছিপে গড়ন, তাকে দেখলে অনেকটা এরকমই লাগে। তার বেশ ভুষাও অনেকটা সেরকম, পাতলা কাপড়ের কার্গো প্যান্ট, ফুল হাতা গ্যাঞ্জি ছাড়া আর কোন বাহুল্য নেই। সাথে দুটি ব্যাগ নিয়ে এসেছে, এই আট ঘণ্টা ভ্রমণের জন্য, যার আয়তন আমি চারমাসে জাহাজে যোগ দেয়ার জন্য যে ব্যাগ নিয়ে এসেছি তার চেয়েও বড়।

জানতে চাইলাম সে চা বা কফি কিছু খাবে কিনা, পানির বোতল আর কোক আগেই রাখা আছে। সে পরিষ্কার জানিয়ে দিল যে তার কিছুই দরকার হবে না। সে উঠেই ন্যাভিগেশনে ব্যস্ত হয়ে পরল আর সাথে সাথে তার ব্যাগ খুলে তার মাল পত্র বের করা শুরু করল। টুথ ব্রাশ থেকে শেভিং কিট, ল্যাপটপ থেকে আইপড। এর পর বের হল পানির বোতল, তার নিজস্ব লেমন ড্রিঙ্ক যেটা সে পানিতে মিশিয়ে নিচ্ছে মাম-প্লাস এর মত। এমনকি সে কফিও নিয়ে এসেছে তার নিজের ব্র্যান্ডের। সে নিজেই কফি ফিল্টার করে নিলো, আমাদের থেকে শুধু একটু চিনি মিশিয়ে নিলো(যেটা মনে হয় কোন কারণে আনতে ভুলে গেছে)। তার দুই ব্যাক প্যাক থেকে ধীরে ধীরে যা বেরুল, তাতে আমাদের এক টেবিল পুরো ভরে গেল। এমনিতে সে খুবই ভদ্র ও নম্র এবং মিতভাষী, কিন্তু কোন প্রশ্ন না করা পর্যন্ত কোন কথা বলবে না, কিন্তু প্রশ্ন করলে সে বিষদ ভাবে বুঝিয়ে বলবে। নদীর তীরে সুন্দর একটি দুর্গের মত বিল্ডিং দেখে কৌতূহল হল, জানতে চাইলাম এটা কি। ইতিহাস সহ জানিয়ে দিল যে এটা এমেরিকার গৃহযুদ্ধের একটি কারাগার, যা দেলোয়ারে কারাগার নামে বিখ্যাত। এখন এটাকে যাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। যাত্রা শুরু হবার ঘণ্টা দেড়েক পরেই আস্তে আস্তে আকাশ আলোকিত হতে শুরু করল, যদিও সূর্যোদয়ের এখনো দেরী, কিন্তু আস্তে আস্তে দিগন্ত রেখা পরিষ্কার হয়ে আসছে।

দেলোয়ারে নদীতে এবারই প্রথম আসা, কিন্তু এর রূপে আমি মুগ্ধ হলাম। নদীর তীর এখন কনক্রিটের জঙ্গলে ভরে উঠেনি, হটাত দেখলে মনে হবে চাঁদপুরের দক্ষিণে মেঘনা নদীর একাংশ। টেক্সাস লুসিয়ানার ওদিকে অনেক নদীপথ, কিন্তু সব দেখতে অনেকটা কৃত্রিম খালের মত সংকীর্ণ ও জ্যামিতিক, দুপাশে আধুনিক আবাসস্থল, নাদীর পার অধিকাংশ জায়গায় সংরক্ষিত। কিন্তু দেলোয়ারে সম্পূর্ণ আমাদের দেশি নদীর মত এলো মেলো, নদীর তীর গাছপালা ঝোপ ঝাড়ে ভরপুর। ইউরোপ বা এমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলি দেখে হয়ত কেউ বলবে ‘আহা ছবির মত সুন্দর’, বা কি সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। কিন্তু দেলোয়ারের এই অগোছালো ভাব দেখলে মনে হবে যে এটা “অকৃত্রিম”। ছবি যতোই ভাল হোক তা কৃত্রিম।

ধীরে ধীরে যতোই উজানে এগিয়ে যাচ্ছি, আস্তে আস্তে কৃত্রিমতা বাড়ছে, আস্তে আস্তে দুই তীর দখল করে নিয়েছে কল কারখানা, পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্র, তৈল শোধনাগার।

যখনই নাগরিক সভ্যতার মুখোমুখি হলাম, রোদ ঝলমলে দিন থেকে হটাত ঘন কুয়াশায় ছেয়ে গেল চারিদিক, এমনকি মাঝে মাঝে আমাদের জাহাজের সম্মুখভাগই ব্রিজ থেকে দেখা যাচ্ছেনা। তবে স্বস্তির ব্যাপার হল কুয়াশা থোক থোক ভাবে ছড়িয়ে। এক দিকে একদম ঘন আবার একটু পরেই কিছুটা পরিষ্কার, এভাবে আলো আধারিতে কানামাছি ভো ভো করতে করতে এগিয়ে গেলাম বন্দরের দিকে। প্রায় এগারোটায় পৌঁছে গেলাম পলসবোরো, নিউজার্সির একটি পোর্ট, নদীর এপারে তৈলশোধনাগার, আর অপর পারে ফিলাডেলফিয়া বিমানবন্দর। বন্দর থেকে মাইল খানেক দূরে আরেকজন পাইলট উঠলেন, যিনি হলেন ডক পাইলট, তার কাজ শুধু জাহাজ বাধা। উনি উঠতেই টাগ চলে এলো, সামনে পেছনে বাধাও হয়ে গেল। দুই টাগই ধাক্কিয়ে নিয়ে গেল একদম জেটির গায়ে, সামনে পেছনে দড়ি কাছি বেধে যখন শেষ করলাম সব কাজ তখন বাজে সাড়ে বারটা। এজেন্ট মেইল করেছে যে কোন কাস্টমস ইমিগ্রেশন আসবে না, এজেন্ট আসবে দু’টা বাজে, সেই সব কাজ সেরে দেবে। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে তিন ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলাম, এর পর সাড়া রাত্র জেগে, ঘুমে চোখ ভেঙে আসছে। দ্রুত লাঞ্চ করে ক্যাবিনে এসে শুয়ে পরতেই ঘুম। কিন্তু সে ঘুম মাত্র ঘণ্টা খানেক এর, সোয়া দু’টায় ফোন এলো এজেন্ট এসেছে, দ্রুত কাপর পরে নিচে গেলাম, গোটা দশেক স্বাক্ষর করতে হবে, কিন্তু এজন্য আমার সাধের ঘুম বিসর্জন দিতে হল। কাজ শেষ করে আর ঘুম ও এলোনা, তবুও বিছানায় গড়াগড়ি করলাম কিছুক্ষণ।

সাতটার দিকে সিম্যান্স সেন্টারের গাড়ি আসবে, বেশ কয়েকজন বাইরে যাচ্ছে, আমিও গেলাম এদের সাথে। আজকাল পরিবর্তিত বিশ্বে নিরাপত্তা এতো বেশী যে অয়েল-ট্যাংকার থেকে বাইরে যাওয়া আর আরেকটি দেশ ভ্রমণে যাওয়া একই রকম হয়ে গেছে। তেলের জাহাজগুলি সাধারণ কোন বন্দরে ভেরে না, আমরা ভিড়ি তৈল শোধনাগারে। প্রত্যেক তৈল শোধনাগারের নিজস্ব জেটি আছে, আর তৈল শোধনাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে খুবই কঠিন। এমনকি জেটিতে পায়ে হাটাও নিষিদ্ধ থাকে অনেক বন্দরে আর রিফাইনারির গেইট ও থাকে জেটি থেকে অনেক দূরে। বাইরের কোন যানবাহনের রিফাইনারিতে ঢুকার অনুমতি থাকেনা, এজন্য সব মিলিয়ে বাইরে যাওয়া একটি জটিল প্রক্রিয়া। সাধারণ নিয়ম হল, ওদের কন্ট্রোল রুমে রেডিওতে কল করে বলতে হবে কখন আমরা বাইরে যাব, সে সময় অনুযায়ী ওরা ওদের গাড়ি দিয়ে আমাদের নিয়ে যাবে গেট পর্যন্ত, তারপর গেইট থেকে ট্যাক্সি নিয়ে যে যেখানে যায়। কিন্তু সবচেয়ে ভাল ব্যবস্থা হল সিম্যান্স সেন্টার এর গাড়ি। উন্নত দেশ গুলিতে নাবিকদের জন্য সিম্যান্স সেন্টার থাকে, তারা জাহাজ থেকে নাবিকদের নিয়ে যায় আবার ফিরিয়ে দিয়ে যায়। এবং সব বন্দর গুলির ভেতরে তাদের গাড়ি প্রবেশ করার অনুমতি থাকে। এমনিতে তৈল শোধনাগারগুলি শহর থেকে একটু দূরে রাখা হয়, তাই সিমেন্স সেন্টার গুলি আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু।

এই সিমেন্স সেন্টারের উৎপত্তি ব্রিটেন থেকে। ১৮৩৫ এ জন অ্যাশলে নামক একজন ব্রিটিশ পাদ্রীর ছেলে তাকে প্রশ্ন করেছিল যে ব্রিস্টল চ্যানেল দিয়ে এতো জাহাজ যায়, এদের নাবিকরা গির্জায় যায় কিভাবে। ছেলের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে তার মাথায় এর সমাধান ঘুরপাক খেতে থাকে, পরবর্তীতে সে ১৮৩৯ সালে প্রথম সিমেন্স মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে অনেক পথে পেরিয়ে আজ পৃথিবীর সমস্ত বন্দরে সিম্যান্স সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদিও অনুন্নত বিশ্বে এর কার্যক্রম অনেক সীমিত, কিন্তু উন্নত বিশ্বে তারা নাবিকদের কাছে অনেক উপকারী একটি সংস্থা, বিশেষ করে ট্যাংকার জাহাজের নাবিকদের কাছে নিঃসন্দেহে। এদের কাজ যদিও শুরু হয়েছিল খ্রিস্টান নাবিকদের চার্চে নিয়ে যাবার জন্যে, কিন্তু বর্তমানে এটি শুধুই একটি সেবামূলক সংগঠন। এরা কেউ কাউকে চার্চে নিয়ে যায় না বা ধর্ম প্রচারের জন্যও আসেনা।

এরা জাহাজে আসে সিম কার্ড নিয়ে, অনেক সময় ক্রিসমাসের আগে সবার জন্য উপহার নিয়ে। বিনামূল্যে পরিবহন ব্যবস্থা করে দেয় বাইরে যাবার জন্য এবং এটা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য। এদের সেন্টারে অনেক বই থাকে, সাধারণ বই, উপন্যাস গল্পের, যে কেউ নিয়ে আসতে পারে বিনামূল্যে। অনেক দেশে সিম্যান্স সেন্টারে ফোন করলে প্রচুর বই জাহাজে এসে দিয়ে যায় নাবিকদের সুবিধার্থে। খ্রিস্টান ধর্মের যাজকরা অনেক দেশেই গিয়েছেন ইউরোপীয় উপনিবেশিক আমলে, তারা অনেক কে ধর্মান্তরিত করেছেন, কিন্তু গির্জা অধিকাংশ সময়ে স্বধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে শোষিতের পক্ষে। বাংলাদেশের অনেক এনজিও কার্যক্রম শুধুই সমাজসেবা মূলক, যদিও তাদের উৎপত্তি হয়েছে ধর্মপ্রচারের জন্য। আমার ব্যক্তিগত ধারনা যে ধর্মের উৎপত্তি মানবতার জন্য, কিন্তু এক্ষেত্রে মনে হয় ইসলাম ধর্ম অনেক পিছিয়ে, আমরা ওয়াজ ব্যতীত অন্য কোন সেবামূলক কাজে ধর্মীয় সংগঠনগুলিকে এগিয়ে আসতে দেখিনা।

সিম্যান্স সেন্টারের গাড়িতে গেলাম ঘুরতে, নিয়ে গেল ফিলাডেলফিয়া। আমাদের কাছে জানতে চাইল আমরা বিশেষ কোথাও যেতে চাচ্ছি কিনা। পরে আমাদের পছন্দ অনুযায়ী একটি শপিং এলাকায় নামিয়ে দিয়ে বলে গেল যে দশটায় এসে আবার নিয়ে যাবে। একটু কেনা কাটা, অতঃপর রেস্টুরেন্টে খাওয়া শেষে জাহাজে ফিরলাম রাত সাড়ে দশটায়। দাপ্তরিক কিছু কাজ কর্ম, কার্গো ডিসচার্জের একটু খবরাখবর নেয়া, কালকে সকালের পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিয়ে দিনের সমাপ্তি ও ঘুম।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে