যমুনেশ্বরী আগের মতো নেই

0
556

জামিল জাহাঙ্গীর : দেওনাই, চাড়ালকাটা, যৌবনেশ্বরী বা যমুনেশ্বরী যে নামেই ডাকি নদী কিন্তু একটাই। এতোগুলো নাম হবার কারণ সময় এবং স্থানভেদে মানুষের ভালোবাসা ও প্রেম। জলপাইগুড়ির রসগ্রাহী জল গড়িয়ে গড়িয়ে দক্ষিণে এসে আজকের রঙ্গ প্রিয় রংপুরের সৃষ্টি। বাউল মইশালে ভরপুর রঙ্গপুরের তামাশা প্রিয়তা এসেছে জলপাইগুড়িবাহিত বাউলিয়ানা থেকে।

যমুনেশ্বরী নদীও ভারত থেকে এসেছে। গিরিরাজ হিমালয়ের দক্ষিনাঞ্চলে রংপুর জেলার অবস্থান। উত্তরের উচু পাহাড়ী এলাকা হতে অসংখ্য নদী উৎপত্তি হয়ে এ জেলার বিভিন্ন অংশের উপর দিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়েছে । বর্তমান নদীসমুহের গতি প্রকৃতি সব সময়ে একরকম ছিল না। বড় বড় ভূমিকম্প ও পাহাড়ীঢলে এসব নদীর গতিপথকে একস্থান হতে আর একস্থানে যেতে বাধ্য করেছে ।

যমুনেশ্বরীর দৈর্ঘ্য ১১৬ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৫০ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। যমুনেশ্বরী নদী অববাহিকার আয়তন ৭০০ বর্গকিলোমিটার। প্রাচীন বরেন্দ্রভূমির এই অঞ্চল ফসল ও ফলমূল উৎপাদনে বহুকাল ধরেই বিখ্যাত। এই নদীতে কোনো সেচপ্রকল্প নেই। যমুনেশ্বরী নদীতে জোয়ার-ভাটার প্রভাব নেই এবং সাধারণত বর্ষা হলে বন্যা হয়।

উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম নদী হিসেবে যমুনেশ্বরী রংপুর জেলার পশ্চিম জনপদকে বহুলাংশে প্রভাবিত করেছে । তবুও ভূগোল বিশারদ রেনেল সাহেব তার মানচিত্রে এটিকে প্রদর্শন করেননি । কিংবা লেখক ঐতিহাসিক ও গবেষকগণ এ নদীর কথা কখনই উল্লেখ করেননি । ঐতিহাসিক এ কে এম নাসির উদ্দিন নীলফামারির ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যমুনেশ্বরী নদীর কথা । তিনি বলেন ডোমার উপজেলার হংসরাজ বিল থেকে উৎপত্তি হয়ে নীলফামারি শহরের দক্ষিণ পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কচুকাটা নামক গ্রামকে পাশে রেখে তারাগঞ্জ উপজেলায় প্রবেশ করেছে । যমুনেশ্বরী বদরগঞ্জ উপজেলার উত্তর পাশ দিযে এ জনপদে এসে প্রবেশ করেছে ।

ঐতিহাসিকের মতে এটি অতিতে যৌবনেশ্বরী নামে প্রবাহিত হতো । কালের বিবর্তনে আস্তে আস্তে এটি যমুনেশ্বরী নামে অভিহিত হয়েছে । উল্লেখ করা হয়েছে যে, এটির উৎপত্তি স্থল নিয়ে নানামুখি কথা প্রচলিত আছে । অনেকের মতে এটি তিস্তা নদি থেকে শাখানদি হিসেবে বের হয়ে এসেছে।

১৮১২ ও ১৮৮৭ সালের পাহাড়ী ঢল ও ভূমিকম্প মূলধারা থেকে এটিকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে এবং এর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে । বর্তমানে এ নদির জল প্রবাহের উৎস বৃষ্টি ও ভূগর্ভস্ত পানি । যমুনেশ্বরীর গতিপথ তিন বৃহত্তর জেলা রংপুর ,বগুড়া ও পাবনার ভিতর দিয়ে প্রায় দুশত মাইল পাড়ি দিয়ে বা্ঘাবাড়িতে এসে ক্লান্ত বেশে হুড়াসাগরে পতিত হয়েছে । পথে পথে এ নদীর তীরে শেখেরহাট, দুরাতীতের জলুবর ,বদরগঞ্জ,নাগেরহাট ও বালুয়া বন্দর গড়ে উঠেছে ।

কালের কলস যমুনেশ্বরী আর আগের মতো নেই । উজানের বাঁধে এখন প্রায় মরে যাবার দশা এই নদীর। রংপুর নীলফামারীর উন্নয়নে এই নদীর বুক জুড়ে উত্থিত হয়েছে অনেক পিলার। দৃশ্যত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের বলি হয়েছে যমুনেশ্বরী। কিন্তু দেওনাই,চাড়ালকাটা, যৌবনেশ্বরী বা যমুনেশ্বরী নামে যে প্রেমিকেরা নাম ধরে ডাকত তারাও এখন আড়াআড়ি ভুসভাস করে পার হয়ে যায়। নদীর দিকে ফিরেও তাকায় না। জল না থাকলে নদীকে কে আর ভালবাসে! নদী পর্ব -২২

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে