পাটের ‘সোনালি’ দিন ফিরছে, নেওয়া হচ্ছে বহুমুখী উদ্যোগ

0
678

সোনালি আঁশের খ্যাতি হারিয়েছিল আমাদের পাট। দুর্দিন জেঁকে বসেছিল এক সময়ে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই শিল্প খাতে। তবে সেই দিন কাটিয়ে আবারও সোনালি আঁশের সেই সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার। এরই মধ্যে পাটের উৎপাদনে এসেছে গতি। পাটজাতীয় পণ্যের উৎপাদনও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। পাটকলগুলোতেও সরকারের রয়েছে বিশেষ নজর। আর আগামী ৬ মার্চ জাতীয় পাট দিবসকে ঘিরেও চলছে বহুমুখী প্রস্তুতি।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে সারাদেশে পাটের চাষ হয়েছিল সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে। ওই সময় পাটের উৎপাদন ছিল গড়ে ৭০ থেকে ৮০ লাখ বেল। এর পরের বছরগুলোর চিত্রও ছিল একই। তবে ২০১৭ সালে মোট ৮ দশমিক ১৭ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। এ বছর ৯২ লাখ বেলেরও বেশি পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে তা হবে পাটের আবাদি জমি ও উৎপাদনের নতুন রেকর্ড।

পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে পাটের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ খাতে গবেষণা বাড়ানো, নতুন পাটনীতি প্রণয়ন, জুটমিল করপোরেশনকে সংস্কারের আওতায় আনা, পাট পণ্যের ব্যবহার উদ্বুদ্ধ করতে পলিথিনের ওপর ইকো ট্যাক্স আরোপ ইত্যাদি উদ্যোগ নিয়ে সরকার কাজ করছে। পাটজাত পণ্যের ব্যবহার দেশে বাড়ানোর পাশাপাশি এসব পণ্য বিদেশে রফতানির দিকেও মনোযোগ রয়েছে সরকারের। এর মাধ্যমে এ খাতের বিশাল বাজার তৈরি করে কর্মসংস্থান বাড়াতে চায় সরকার।

সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে রফতানি বাজার সম্প্রসারণ, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, পরিবেশ সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে পাট। তাই পাট নিয়ে গবেষণা করে এর বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। ব্যাগ ও বস্তার বাইরে এখন পাট দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে জুতা, স্যান্ডেল, রুমাল, কাপড়, বিছানার চাদর, টুপিসহ বিভিন্ন ধরনের সৌখিন সামগ্রী।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর বাইরেও বিভিন্ন আসবাব, তৈজসপত্র, পোশাক, শীতবস্ত্র, সোফা, বিভিন্ন ধরনের কাগজ, হার্ডবোর্ড তৈরিতেও পাট ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব বলে বিশ্বব্যাপী এগুলোর চাহিদা বাড়ছে। বিভিন্ন পণ্যের মোড়ক বা প্যাকেজিং করতে এখন পাটের ব্যবহার অনেক বেড়েছে।

জানা গেছে, দেশের বস্ত্র কারখানাগুলোয় এখন তুলার সঙ্গে পাট মিশিয়ে সুতা তৈরি করা হচ্ছে। সেগুলো দিয়ে তৈরি হচ্ছে কাপড়। এসব পোশাক বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, ইন্ডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, চায়না, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন বাংলাদেশ থেকে পাটের বস্তা কেনার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর কাঁচা পাট রফতানিতে প্রবৃদ্ধি এখন ৪৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

গত কয়েক বছরে পাটের ব্যবহার বাড়তে থাকায় তাই আবার পাট নিয়ে ইতিবাচক দিকে হাঁটছে সরকার। এ কারণেই গত বছর থেকে সরকার পালন করতে শুরু করেছে জাতীয় পাট দিবস। এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো দিবসটি পালিত হবে আগামী ৬ মার্চ। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে— ‘সোনালী আঁশের সোনার দেশ, পাট পণ্যের বাংলাদেশ’।

দেশে পাটের ব্যবহার ও রফতানি বাড়াতে জাতীয় পাট দিবসে বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। কেবল রাজধানী নয়, জেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যন্ত পালিত হবে এসব কর্মসূচি। পালিত হবে তিন দিনব্যাপী পাটজাত পণ্যের মেলা। দেশের বাইরেও কর্মসূচি রাখা হয়েছে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন, ‘দেশে পাটের বাজার বাড়াতে ধান, গম, চাল, ভুট্টা, চিনি, মরিচ, হলুদ, আদা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া, আটা, ময়দা, খুদ, কুড়াসহ ১৭টি পণ্যের মোড়কে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাট খাতের উন্নয়নে সরকার পাট আইন- ২০১৭ প্রনয়ণ করেছে। বিশ্ববাজারে পাটকে তুলে ধরতে ২৩৫ ধরনের পাটজাত পণ্য উদ্ভাবন করেছে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি)।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করায় অভ্যন্তরীণ বাজারে একশ কোটি পাটের বস্তার চাহিদা তৈরি হয়েছে। পাট চাষিদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি ‘বাংলার পাট বিশ্বমাত’ শীর্ষক স্লোগান নিয়ে পাট শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।’’
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্র জানায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৯ দশমিক ৬২ লাখ বেল পাট ও পাটজাত দ্রব্য রফতানি করে সাত হাজার ২৯৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই পরিমাণ ৮৭৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বেশি। এ ছাড়া, বছরে ১২ লাখ বেল কাঁচা পাটও রফতানি হচ্ছে।

জানা গেছে, পাটজাত পণ্যকে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের তালিকাভুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী পাট শিল্পের ব্লক ঋণ ফেরত দেওয়ার সময় ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়েছে। ইডিএফ ফান্ডের মতো পাট শিল্পের জন্য ২ ভাগ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল তৈরির বিষয়েও চিন্তাভাবনা করছে সরকার।
বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিজেএমসি’র পাটকলগুলো ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯৫ হাজার মেট্রিক টন পাটপণ্য উৎপাদন করেছে। এই অর্থবছরে বিজেএমসি’র মোট আয় একহাজার ১৫৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, ব্যয় এক হাজার ৮৫০ কোটি ৯ লাখ টাকা। গত অর্থবছরেও বিজেএমসি’র পাটকলের লোকসান ছিল ৬৯৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। তবে এ বছর তা অনেক কমে গেছে।
বিজেএমসি’র লোকসান প্রসঙ্গে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন, ‘‘এ বছর বিজেএমসি’র লোকসান ১৮০ কোটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে বিজেএমসি রাষ্ট্রের ‘ডিজ্যাবল’ সন্তান। রাষ্ট্র বিজেএমসির প্রতি বিশেষ নজর রাখছে।’’

জানা গেছে, পাটের হারানো দিন ফিরিয়ে আনতে পাটকল আধুনিকিকরণেও কাজ করছে সরকার। এরই মধ্যে বিজেএমসি’র অধীন মিলগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে তিনটি পাটকলের আধুনিকায়নে চীনের সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি সই হয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে