কোন দেশে হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতিযোগিতা!

0
730


একদিন আমার বাচ্চাকে বেবি স্ট্রলারে নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। ঝকঝকে পরিষ্কার পথ।
হঠাৎ এক টুকরো কাগজ বেবি স্ট্রলার (বাচ্চাদের যে ঠেলাগাড়িতে করে বহন করা হয়) থেকে রাস্তায় পড়ে গেল। বাতাস ছিলো বলে কাগজটা উড়ে অনেক দূর চলে গেল। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। এত সুন্দর পরিচ্ছন্ন একটা রাস্তায় আমার ওই এক টুকরো কাগজ খুব বেমানান লাগছিলো। আমার বিবেক আমাকে আমার জায়গায় থাকতে দেয়নি।
দৌড়ে গিয়ে কাগজটা তুলে ব্যাগে ভরে ফেললাম, এক অজানা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দায়মুক্ত হলাম। সেদিন আমার বিবেক আমাকে আরেকটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলো।
যদি আমার নিজের দেশের মাটিতে এই একই কাগজের টুকরোটা পড়তো, তাহলে কী আমি ওটা রাস্তা থেকে তুলে ব্যাগে ভরতাম? মনে হয় না! বরং ব্যাগে আরো কিছু আবর্জনা থাকলে তা ওই রাস্তাতেই ঝেড়ে ফেলতাম।
২০১৩ সালে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। তখন পরিবারের সবাইকে নিয়ে আহসান মনজিলে বেড়াতে গিয়েছি। ঈদের মৌসুম ছিল বলে প্রচুর ভিড় ছিলো সেদিন। লক্ষ্য করলাম, পুরো মাঠজুড়ে রঙ-বেরঙের কাগজ। সাদা কাগজের সংখ্যাই বেশি। দূর থেকে মনে হচ্ছে কেউ যেন সযত্নে সাদা সাদা ফুলে আহসান মনজিলের মাঠ ঢেকে দিয়েছে।
আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, মাঠের মাঝখানে একটা পরিত্যক্ত ড্রাম তীর্থের কাকের মতো বসে আছে। কখন তাকে ব্যবহার করা হবে সেই প্রতীক্ষায়! হয়তো সারাদিন বসে বসে এই শূন্য ড্রামখানা মনে মনে এই গানটাই গায়- ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয়, ফিরে আয় ফিরে আয়’।


আমরা বাঙালিরা অন্যের দেশ পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে সচেতন। অথচ নিজের দেশের বেলায় উদাসীন! এর পেছনে অবশ্য উপযুক্ত যুক্তিও আছে। জাপানে আসার পর এদেশের প্রতিটি জায়গা আমাকে মুগ্ধ করেছিলো। রাস্তাঘাট,পার্ক, মার্কেট এমনকি হাসপাতাল- কোথাও আমি বিচ্ছিরি আর ময়লা দেখিনি।
তার মানে কি এই যে জাপানে কোন ময়লা-আবর্জনা নেই! অবশ্যই আছে। কিন্তু আবর্জনা ঠিক জায়গায় ফেলার মতো মানসিকতা আর সদ্বিচ্ছা এদেশের প্রতিটি মানুষের আছে।
এখানে রাস্তার পাশে ডাস্টবিনের ময়লা ডাস্টবিনেই ফেলা হয়। আর যদি আশপাশে ডাস্টবিন না থাকে তবে আমার মতো সবাই ব্যাগে ভরে এনে সঠিক জায়গায় ফেলেন। পার্কে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীরা পার্কটাকে কখনও ময়লার স্তুপ বানিয়ে ফেলেন না।
পুরো দেশটাই যেন একটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন-পরিপাটি দেশ। যেন একটা স্বপ্নপুরী। চারদিকে রুচিশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। পথচারীরা কখনই সুন্দর পথটাকে আবর্জনা ফেলে অসুন্দর করেন না।
এর পেছনে সরকারের একটা ভূমিকা আছে। জাপান সরকার চমৎকার একটা কৌশল অবলম্বন করেছিলো, যার ফলে আজকে এই সোনালি জাপান। কার শহর কত বেশি সুন্দর-পরিপাটি আর পরিচ্ছন্ন, এমন একটা প্রতিযোগিতা চালু করা হয়েছিলো প্রতিটি শহরবাসীর মধ্যে। আমার শহর কানাগাওয়াতেও সৌন্দর্য বাড়ানোর এই প্রতিযোগিতায় সবাই সানন্দে অংশ নিয়েছিলেন।
কেউ কেউ নিজেদের উদ্যোগে এলাকায় ডাস্টবিন বানালেন। তখন আবার দেখা গেল-ডাস্টবিনের আশপাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে আবার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তখন শহুরে জনগণ নিজস্ব উদ্যোগে নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভ্যানগাড়িতে ময়লা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ডাস্টবিন ভেঙে ফেললেন। শহরের চেহারাও অনেক পরিবর্তন হলো।
এভাবে সব শহরের ছোট ছোট এলাকায় গণসচেতনতা তৈরি হওয়ার পর, ধীরে ধীরে আস্ত একটা নগরীই পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠলো। শিশুরাও যথেষ্ট সচেতন হতে শিখলো পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে। ছোটবেলা থেকেই এদের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে শিক্ষা দেওয়া হয়।
যখন জাপানের দিকে তাকাই তখন প্রিয় স্বদেশকে নিয়ে ভাবি। স্বপ্ন দেখি, আমাদের দেশও একদিন স্বপ্নের দেশে পরিনত হবে। আমার সন্তানরা এখনও বাংলাদেশ দেখেনি। আশা রাখি আগামীতে যখন ওদের নিয়ে দেশে যাব, ওরা নিজ মাতৃভূমি নিয়ে গর্ব করবে। ওরা যেন বলতে পারে, আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী!

লেখকঃ জাপান প্রবাসী বাংলাদেশী। ছবিঃ রয়টার্স

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে