২২ ডিসেম্বর গৌরনদী মুক্ত দিবস

0
380
সরকারি গৌরনদী কলেজ যেখানে পাক-সেনারা স্থায়ী ক্যাম্প করেছিল

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশের বিজয় ঘোষিত হলেও বরিশালের গৌরনদী পাক-হানাদার মুক্ত হয়েছিলো ২২ডিসেম্বর। বাংলাদেশের মধ্যে সর্বশেষ বিজয় পতাকা উড়েছিল গৌরনদী’তে। টানা ২৮ দিন মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর যৌথ আক্রমণের পর ওইদিন গৌরনদী কলেজ ক্যাম্পে অবস্থানরত শতাধিক পাক সেনা মিত্র বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করেছিল। হানাদার বাহিনী অত্র এলাকায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাঁচ সহস্রাধিক নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা ও তিন শতাধিক মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছিল।

সূত্রমতে, ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল হানাদাররা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক দিয়ে এ জনপদে প্রবেশের মাধ্যমে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তাদের প্রবেশের খবর শুনে গৌরনদীর সাউদের খালপাড় নামকস্থানে তাদের প্রতিহত করার জন্য অবস্থান নেয় মুক্তিযোদ্ধারা। হানাদাররা সেখানে পৌঁছুলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। হানাদারদের সাথে সেইদিন সম্মুখ যুদ্ধে প্রথম শহীদ হন নাঠৈর সৈয়দ হাসেম আলী, চাঁদশীর পরিমল মণ্ডল, গৈলার আলাউদ্দিন ওরফে আলা বক্স ও বাটাজোরের মোক্তার হোসেন। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে ওইদিন আটজন পাক সেনা নিহত হয়। এটাই ছিল বরিশালে স্থলপথে প্রথম যুদ্ধ। বরিশালের প্রবেশদ্বারের মুখে পাক হানাদাররা গৌরনদীর খাঞ্জাপুরে মোস্তান নামক এক পাগলকে গুলি করে হত্যা করেছিল। সেইদিনের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওইদিন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আটজন পাকিস্তানী সেনা নিহত হবার পর তারা ক্ষিপ্ত হয়ে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। তাদের গুলিতে ওইদিন দুই শতাধিক লোক মারা যায়। হানাদাররা গৌরনদী বন্দরসহ শত শত ঘর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মে মাসের প্রথম দিকে পাকবাহিনী গৌরনদী কলেজে স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে। ক্যাম্পে ছিল দেড় শতাধিক সৈন্য ও ৫০ জনের মতো রাজাকার, আলবদর। বাটাজোর, ভুরঘাটা, মাহিলাড়া, আশোকাঠী, কসবাসহ প্রতিটি ব্রিজে পাক মিলিটারিদের বাঙ্কার ছিলো। উত্তরে ভুরঘাটা, দক্ষিণে উজিরপুরের শিকারপুর, পশ্চিমে আগৈলঝাড়ার পয়সারহাট, পূর্বে মুলাদী পর্যন্ত গৌরনদী কলেজ ক্যাম্পের পাকসেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। এদের দোসররা ছিলো এলাকার রাজাকার, আলবদর ও পিস কমিটির সদস্য।

এরা হত্যাকাণ্ড, লুটতরাজ, নারী ধর্ষণসহ নানা কাজে হানাদারদের সহযোগিতা করতো। পাক সেনারা গৌরনদী কলেজের উত্তর পার্শ্বে একটি কূপ তৈরি করে সেখানে লাশ ফেলতো। কলেজের উত্তর পার্শ্বে হাতেম পিয়নের বাড়ির খালপাড়ের ঘাটলায় মানুষ জবাই করে খালের পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হতো। গার্লস হাইস্কুলের পার্শ্ববর্তী পুল ও গয়নাঘাটা ব্রিজের উপর বসে মানুষ খুন করে খালে ফেলতো পাক সেনারা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় আরও জানা গেছে, শত শত লোক ধরে এনে ওইসব স্থানে হত্যা করা হতো।

গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ার ইতিহাসে সবচেয়ে লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছিলো ১৯৭১ সালের ১৫ মে। ১৪ মে দোনারকান্দিতে চিত্ত বল্লভের নেতৃত্বে স্থানীয় লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পাক হানাদারদের মুখোমুখি ঝাঁপিয়ে পড়ে চারজন পাক সেনাকে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় পাকসেনারা ক্ষিপ্ত হয়। কসবার হযরত মল্লিক দুধকুমার পীর সাহেবের মাজার সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে চাঁদশী হয়ে পশ্চিম দিকে শতাধিক সেনা অগ্রসর হয়ে জনতার উপর এলএমজির ব্রাশ মারে এবং গুলি করে পাখির মতো মানুষ মারতে থাকে। পাক সেনাদের ভয়ে সেদিন আশেপাশের সাত থেকে আটটি গ্রামের ৪/৫ হাজার মানুষ এদিক সেদিক ছুটাছুটি করতে থাকে। রাংতার উত্তর পাশের সুবিশাল ক্যাতনার বিলে ধান ও পাট ক্ষেতের মধ্যে আশ্রয় নিতে এসে পাক বাহিনীর গুলিতে ওইদিন পাঁচ শতাধিক লোক প্রাণ হারায়। নরপশুদের কবল থেকে সেদিন পশুরাও রেহাই পায়নি। শত শত ঘর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ফলে বহু গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগী মারা যায়।

২ আষাঢ় কোদালধোয়া নামক স্থানে দি রয়েল বেঙ্গল সার্কাসের মালিক লক্ষণ দাস ও তার একটি পোষা হাতিকে পাকসেনারা এক সাথে গুলি করে হত্যা করে। জুলাই মাসে বাটাজোরে নিজাম বাহিনীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে ১০জন পাকসেনা মারা যায় এবং চারজন জীবিত ধরা পরে। পাকসেনাদের গতিরোধ করার জন্য ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের আশোকাঠী বাসস্ট্যান্ডের ব্রিজ মুক্তিযোদ্ধারা ভেঙে দিয়েছিল অক্টোবর মাসের শেষের দিকে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার নিজাম উদ্দিন আকনের নেতৃত্বে ব্রিজটি সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এর কয়েকদিন পর নিজাম উদ্দিনের নেতৃত্বে হোসনাবাদে পাকবাহিনীর অস্ত্র ও মালবাহী বোটে হামলা চালিয়ে প্রচুর অস্ত্র উদ্ধার করেছিল মুক্তিবাহিনীরা। ওইদিন যুদ্ধে প্রায় ২৫ জন পাকসেনা মারা যায়। মুক্তিযোদ্ধা সাব-সেক্টর কমান্ডার নিজাম উদ্দিনের সাথে অংশ গ্রহণকারী অন্যান্য গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন, ছাত্তার কমান্ডার, কমান্ডার বাদশা হাওলাদার, কুতুব উদ্দিন, তাহের কমান্ডার, কাদের কমান্ডার, নজরুল কমান্ডার, মুনসুর আহম্মেদ, হামেদ কমান্ডার ও আলাউদ্দিন মিয়া।

জানা গেছে, গৌরনদীর কসবা এলাকার মসজিদের কাছে ২৭ নভেম্বর পাক বাহিনীর সাথে বন্দুক যুদ্ধে মো. ছাত্তার কমান্ডার গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। পরেরদিন একইস্থানে দক্ষিণ চাঁদশীর আলতাফ হোসেন শহীদ হন। গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া এলাকার কৃষক শ্রমিক নেতা আব্দুর রব সেরনিয়াবাত (সাবেক মন্ত্রী), আব্দুল করিম সরদার (সাবেক এমএলএ) সর্বপ্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘবদ্ধ করে তাদের ট্রেনিং প্রদানের জন্য ভারতে নিয়ে যান। কোটালীপাড়ার মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত হয় হেমায়েত বাহিনী। তিনি সর্বপ্রথম অত্র অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। তার নেতৃত্বে আগৈলঝাড়ার শিকির বাজার, রামশীল ও পয়সারহাটে পাক সেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখে যুদ্ধ হয়। পরবর্তীতে গৌরনদীর হোসনাবাদ গ্রামের নিজাম উদ্দিন আকনের নেতৃত্বে ৬০ থেকে ৭০ জন মুক্তিবাহিনীর একটি দল ভারত থেকে প্রশিক্ষণ শেষে গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ায় আসেন। নিজাম উদ্দিন কৃতিত্বের সাথে স্বাধীনতা যুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সর্বশেষে মুজিব বাহিনীর একটি দল ভারত থেকে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ (এমপি), তার চাচাত ভাই রকিব সেরনিয়াবাত, কসবার ফজলুর রহমান হাওলাদার, বিল্বগ্রামের মেজর শাহ আলম তালুকদার ছিলেন তার সহযোগী। গৌরনদী কলেজে নিজাম বাহিনী ও মুজিব বাহনীর যৌথ প্রচেষ্টায় আক্রমণ চালানো হয়েছিল। পশ্চিম দিক থেকে মুজিব বাহিনী ও পূর্বদিক থেকে নিজাম বাহিনী আক্রমণ করে। দীর্ঘদিন যুদ্ধের পর পাক সেনারা পরাস্ত হয়ে ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর মেজর ডিসি দাসের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করে। ইত্তেফাক/জামান

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে