বাড়তি ভাড়ায়ও বাসে ওঠার জন্য মরিয়া, সংঘাত-সংঘর্ষ

0
6

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সরকারি অফিস ছাড়া আর কোথাও ৫০ ভাগ জনবল অফিসে আর ৫০ ভাগ বাসায় বসে কাজ করার আদেশ কার্যকর হয়নি৷ এদিকে গণপরিবহনে মোট সিটের অর্ধেক যাত্রী নেয়া শুরু হয়েছে বুধবার থেকে৷ ফলে যাত্রীরা পড়েছেন সংকটে৷

কাজে যেতে হবে বলে করোনা নিয়ে ভাবার সময় নেই, যে করে হোক বাস পেতে হবে৷ এ নিয়ে বুধবার সকালে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি জায়গার বাসের স্টাফদের সাথে যাত্রীদের সংঘর্ষ হয়েছে৷

সকালে আজিমপুর, কুড়িল বিশ্বরোড, ভিক্টোরিয়া পার্ক, যাত্রাবাড়ি ও মাওয়াসহ আরও কয়েকটি এলাকায় যাত্রীরা বাসে উঠতে না পারায় পরিবহন শ্রমিকদের সাথে হাতাহাতি ও মারামারি হয়েছে বলে জানান পরিবহন মালিকেরা৷ এমনকি বিক্ষুব্ধ যাত্রীরা তাদের না নেয়ায় বাস আটকে দেয়া হয়৷ যাত্রীরা বলছেন, অফিসে যেতে হবে৷ সিট না থাকলেও নিতে হবে৷ পুলিশ পরে ওইসব এলাকায় সব যাত্রীকে বাসে উঠতে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়৷

দুপুরে সরেজমিন কারওয়ান বাজারে গিয়ে একই পরিস্থিতি দেখা যায়৷ যাত্রী রুবেল মিয়া ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেও বাসে উঠতে পারছেন না৷ তিনি বলেন, ‘‘এখন দুই সিটে একজন যাত্রী নেয়ায় বাসের সিট অর্ধেক হয়ে গেছে৷ ফলে বাস যেখান থেকে ছাড়ে সেখান থেকেই যাত্রী পূর্ণ হয়ে যায়৷ এখন সব বাসই সিটিং সার্ভিস হয়ে গেছে৷ আর সিট যদি খালিও থাকে তাহলে অল্প  দূরত্বের যাত্রী তার নিতে চায় না৷ ভাড়াও বেড়েছে শতকরা ৬০ ভাগ৷ তারও অতিরিক্ত তারা আদায় করছে৷’’

মোহাম্মদপুর- মতিঝিল স্টাফ কোয়ার্টার রুটে এখন জন প্রতি ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৭৫ টাকা৷ আগে ছিলো ৫০ টাকা৷ আর করোনা  আগে ছিলো ৪০ টাকা৷ ওই রুটের একটি বাসের হেলপার এরশাদ মিয়া বলেন, ‘‘আজ সকাল থেকে যাত্রীদের সাথে ভাড়া নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে৷ আবার সিট পূর্ণ হওয়ার পর যাত্রীরা জোর করে বাসে উঠতে চাচ্ছেন৷ আমরা গেট বন্ধ করে রাখলেও ট্রাফিক সিগন্যালে জোর করে উঠতে চায় ৷ এনিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে আমাদের তর্কাতর্কি ও ঝামেলা হচ্ছে৷’’

কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে দুপুরে বিভিন্ন রুটের যেসব বাস আসা যাওয়া করতে দেখা গেছে তার অধিকাংশেরই গেট ছিলো বন্ধ৷ ট্রাফিক সিগন্যাল না থাকলে তারা থামেনি৷ কারওয়ান বাজারে দুই নারী দুই ঘন্টা অপেক্ষা করেও বাসে উঠতে পারেননি৷ তারা জানান, ‘‘দুই-একটি বাসে সিট থাকলেও নারীদের সিট নেই বলে তাদের উঠতে দেয়া হয়নি৷’’ কিন্তু বাস্তবে বাসে উঠে দেখা যায় বাসগুলো নারীদের জন্য অর্ধেক আসন খালি রাখার নিয়ম মানছে না৷ তারা সিটিং বলে আগেই পুরুষ যাত্রী দিয়ে আস পূর্ণ করে আসছে৷

রুবেল আহমেদ নামে একজন যাত্রী জানান, ‘‘সিট খালি থাকলেও স্বল্প দূরত্বে যাওয়ার কথা বললে তারা যাত্রী তুলছেন না৷’’ তিনি বলেন, ‘‘আমি ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজার আসলেও আমরা কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হয়েছে ১৫ টাকা৷ বাস্তবে ভাড়া পাঁচ টাকা৷ বাসের কর্মচারীরা বলেন, তাদের ভাড়া হিসাব হয় ফার্মগেট থেকে বাংলা মটর৷ আগে কারওয়ান বাজার নামলেও একই ভাড়া৷’’ আরেকজন যাত্রী রাসেল আহমেদ জানান, ‘‘এখন বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ১০টাকা৷ এক কিলোমিটার গেলেও ১০টাকা, আধা কিলোমিটারও ১০ টাকা৷’’ একজন কন্ডাকটর এটা স্বীকার করে বলেন, ‘‘বাসে উঠলেই ১০ টাকা৷’’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ খোকন বলেন, ‘‘যাত্রীদের কাছ থেকে আগেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হত৷ আর এখন তার ওপরে আরো ৬০ ভাগ বড়তি ভাড়া তাদের জন্য চাপ হয়ে গেছে৷’’ তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঢাকার মধ্যে বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটার ১ টাকা ৬০ পয়সা৷ এখন করোনার কারণে যাত্রী সিটের অর্ধেক নেয়ার কারণে  ভাড়া ৬০ ভাগ বাড়ালে প্রতি কিলোমিটার হয় ২ টাকা ৪৬ পয়সা৷ উত্তর বাড্ডা থেকে গোলাপশাহ মাজারের দূরত্ব আট কিলোমিটারের চেয়ে কিছু কম৷ ৬০ ভাগ বাড়িয়ে ভাড়া হওয়া উচিত সর্বোচ্চ ২০ টাকা৷ কিন্তু নেয়া হচ্ছে ৩০ টাকা৷ কারণ তারা আগেই ভাড়া বাড়িয়েছে৷ এখন সেই বাড়তি ভাড়ার ওপর আবার বাড়িয়ে নিচ্ছে৷ ঢাকার বাইরেও একই অবস্থা বলে জানান তিনি৷

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিরি সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ বলেন, ‘‘নিয়মের বাইরে ভাড়া না নেয়ার জন্য আমাদের কড়া নির্দেশনা আছে৷’’

তবে একজন পরিবহন মালিক বলেন, ‘‘ভাড়া একটু বেশি না নিলে আমরা গাড়ি চালাতে পারব না৷ এই নতুন নিয়মে আমরা তিন ভাগের দুইভাগ যাত্রী হারাচ্ছি৷ কারণ সরকার তো সিটের হিসাব করে ৬০ ভাগ ভাড়া বাড়িয়েছে৷ কিন্তু সিটের বাইরে আরও অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে যাতায়াত করেন৷ সেটাও তো আমাদের লস হচ্ছে৷ সেই হিসাব তো করা হচ্ছে না৷’’

খন্দকার এনায়েতুল্লাহ বলেন, ‘‘কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি বেসরকারি অফিস কোথাও ৫০ ভাগ জনবল অফিসে এবং ৫০ ভাগ জনবল বাসায় রেখে কাজ করার নিয়ম কার্যকর হয়নি৷ শুধু আমরা যাত্রী পরিবহন অর্ধেকে নামিয়ে আনায় নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি৷ যাত্রীদের তোপের মুখে পড়ছেন আমাদের পরিবহন কর্মচারীরা৷ কারণ যাত্রী কমে নাই, কিন্তু সিট অর্ধেক হয়ে গেছে৷ যাত্রীরা কথা শুনতে চাচ্ছেন না৷ তারা যেকোনোভাবে বাসে উঠে অফিসে বা কাজে যেতে চাচ্ছেন৷ কয়েকটি জায়গায় মারামরিও হয়েছে৷ পুলিশও সামাল দিতে পারছে না৷’’

তার মতে, ‘‘এই পরিস্থিতি  অব্যাহত থাকলে প্রতিনিদিনই নানা অঘটন ঘটেবে৷ তাই নিয়ম সবখানে কার্যকর করতে হবে৷ তাহলে যাত্রীর চাপ কমবে৷’’

সরেজমিন দেখা গেছে প্রায়  সব বাসেই যাত্রী অর্ধেক ছিল৷ তবে বিআরটিসির বাসে যাত্রী দেখা গেছে বেশি৷ আর মাস্ক ব্যবহারেও যাত্রীরা সচেতন ছিলেন৷ কিন্তু গাড়ির ড্রাইভার ও হেলপারদের  মাস্ক ব্যবহারের নিয়ম মানায় তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি৷

গত বছর করোনায় দুই মাস গণপরিবহন বন্ধ ছিলো৷ সাধারণ ছুটি শেষে গত বছরের জুলাই মাস থেকে অর্ধেক সিট খালি রেখে যাত্রী নেয়ার শর্তে গণপরিবহণ চালু হয়৷ তখনো ভাড়া ৬০ ভাগ বাড়ানো হয়৷ তবে এই ব্যবস্থা বেশি দিন চলেনি৷ পরিবহন মালিকদের চাপের মুখে কিছু দিন পরোই স্বাভাবিকভাবে যাত্রী নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়৷ তখন মালিকেরা বাড়তি ৬০ ভাগ ভাড়া প্রত্যাহারের কথা বলেন৷ কিন্তু বাস্তবে পুরো ৬০ ভাগ প্রত্যাহার হয়নি বলে অভিযোগ আছে৷DW (ডয়েচে ভেলে)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে