দারুচিনির দেশে কবি নাহিদ রীটা

0
49

শ্রীলঙ্কা দেশটা আমার ব্যাক্তিগত ভাবে অনেক প্রিয়। অল্প কিছুদিন ছিলাম, কিন্তু অনেক স্মৃতি দিয়েছে এই দেশ। কয়েকজন আপন মানুষ দিয়েছে। অনেক জায়গায় ঘুরেছি, কখনও মনে হয় নাই ভীন দেশে এসেছি। কারো আক্কি হয়ে গেছি, কারো প্রিয় বান্ধবী।

এক টুকটুক ড্রাইভারকে তো কখনও ভোলা যাবে না। প্রতিদিন আমার এপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত ঠিক আমার অফিসে যাওয়ার সময়ে। একটা কথাও হত না। অফিসের সামনে নেমে ভাড়া দিয়ে দিতাম। মাঝখানে তিন দিনের টানা ছুটি পড়ল। শনি রবি, তার আগে পয়া ডে হিসাবে শুক্রবার যোগ হল। পয়া ডে হল প্রতিমাসের পুর্নিমার দিন। প্রতি পুর্নিমাতে শ্রীলঙ্কায় ছুটি থাকে। রোমান্টিক দিন হিসাবে না। বৌদ্ধপুর্নিমা হিসাবে।

যাহোক, তিন দিন ঘরে বসে কি করব। তখন কাছের কেউ তৈরি হয় নাই। সিদ্ধান্ত নিলাম ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ব যে কোন এক দিকে। শ্রীলঙ্কার ভৌগোলিক ভাবে পিরামিডের মত। চতুর্দিকে ঢালু হয়ে সমুদ্রে মিশেছে, মাঝখানটা উচু হয়ে পিরামিডের চুড়ার মত অতি উচ্চ। যেখানে ক্যান্ডি অবস্থিত।

অনেকেই কান্ডি যায়গাটার নাম শুনেছেন ক্রিকেটের সুবাদে। সিদ্ধান্ত নিলাম সমুদ্র দর্শনে যাব আর ট্রাভেলারের স্বাদ গ্রহন করব। ট্রাভেলার টুরিস্ট কিন্তু এক বিষয় না। দক্ষিণের শেষ মাথা ভারত মহাসাগরের দিকে মিশেছে। চারিদিকে নীল সমুদ্র বেষ্টনী। গুগলিং করে কিছু ছবি দেখে নিলাম।

ঢাকা থেকে যাওয়ার আগে এক বন্ধুস্থানীয় দুর্সম্পর্কের বন্ধু ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন লোনলি প্ল্যানেট তার কাছে আছে, আমি নিতে চাই কিনা। ভ্রমনের খুটিনাটিসহ নানা বিষয়ে কাজে দিবে। গুগুল আসার আগে এই লোনলি প্ল্যানেট ভ্রমনকারীদের কাছে খুব পরিচিত ছিল। পরে তিনি ইমেইলে পাঠিয়েও দিলেন। আমার সেটা আর খোলা হয় নাই। উদ্দেশ্য যে জায়গাতে যাব সেখানটাকে আমি আমার মত করে আবিষ্কার করতে চাই।

বৃহস্পতিবার অফিস থেকে ফিরে বাসায় সামনে টুকটুক থেকে নেমে ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম, খুব ভোরে স্টেশনে যাব, সে পৌছে দিবে না। শুনেই একখান সরল হাসি। এই সহজ সরল হাসি শ্রীলঙ্কানদের একটা ইউনিক বৈশিষ্ট্য। যে খানে যে প্রান্তে গেছি যখনই যে পথচারীর চোখাচোখি হয়েছে, স্বাগত উপহার হিসাবে একখান ফ্রি হাসি। আহ! মন ভরে যায়। ক্ষনকালের জন্যে মনে হয় এ আমার আপন দেশ।

পরদিন খুব ভোর মানে ৫ টায় একটা ব্যাকপ্যাকে যতটুকু আটে সেই পরিমান কাপড়চোপর আর প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস ঢুকিয়ে পিঠে ফেলে বেরিয়ে পড়লাম। স্টেশনে পোছলাম তখন প্রায় পৌনে ছয়টা কি ছয়টা। স্টেশনে অনেক ভিড়। সবাই স্টেশনে গ্রামে অথবা হোমটাঊনে কিংবা আমার মত ঘুরতে বের হয়েছে।

ড্রাইভারটিও আমার সাথে সাথে স্টেশনের কাউন্টারের দিকে এগোচ্ছে। বাঙ্গালী সাবধানী মনে হঠাৎ করে ভয় জমে উঠল। হ্যান্ডব্যাগটা সবার আগে ভালমত জাবটে ধরলাম। আমি কাউন্টারের দিকে যতই এগোচ্ছি, সেও ততই আমার সাথে দূরত্ব কমিয়ে একদম কাছে চলে এল। কাউন্টারের সামনে পৌছতেই একটা মনে মনে হোচট খেলাম। ভিষণ ভিড় আর কোনটা যে দক্ষিনের জন্যে লাইন বোঝার উপায় নেই।
এবার মুখ ফিরিয়ে টুকটুক ড্রাইভারের দিকে তাকালাম। সেই পরিচিত হাসি। সেও সম্ভবত বুঝতে পেরেছে আমি ঝামেলায় পড়ে গেছি। এতক্ষনে আমি বুঝতে পারলাম আমাকে পিছু করার কারণটা কি ছিল। স্যারেনডার করল আমার সাবধানী মন।

ড্রাইভারটি এসে শর্টকাট ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করল কোথায় যেতে চাই? বললাম গ্যল, শেষ স্টেশন। শেষ স্টেশন পর্যন্ত টিকিট কেটে নেয়ার কারণ হল ট্রেন চলতে চলতে যদি কোথাও নেমে পড়তে ইচ্ছে করে নেমে যাব, অথবা শেষ স্টেশন থেকে উল্টোদিকে ঘোরা শুরু করব।

আবারো শর্টকাট ইংরেজিতে বললাম কত রুপি লাগবে? পরিমানটা শুনে আমি স্তম্ভিত। রাতেই আমার কুক এনথোনিকে জিজ্ঞাসা করে রেখেছিলাম গ্যল পর্যন্ত ভাড়া কেমন হতে পারে। ফার্স্ট ক্লাশে গেলে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। অগত্যা ১৫০০ রুপি ড্রাইভারের হাতে দিয়ে আমি অপেক্ষা করছি, সে যেন এদিক সেদিক দৌড় দিতে না পারে। কড়া দৃষ্টি আমার তার উপর। কিন্তু সে আসলেই ব্যস্ত তখন টিকেট কাটতে। আমার মনের দ্বন্ধ তখনও যাচ্ছে না। তারপর দেখলাম একটা টিকেট আর বাকী ৪০০ রুপি আমার হাতে দিল। আমার শংকাপুর্ন মন তখন কিছুটা সস্তি পেলেও তখন মনে নতুন করে যোগ হলো কৌতূহল! ৩০০ রুপির যায়গায় ১১০০ রুপির টিকেট দিয়ে সে আমাকে কোথায় পাঠাতে চায়!!??

শ্রীলঙ্কার দক্ষিণে গ্যলই শেষ স্টেশন। আমি তখন কৌতুহলের জালে ঘোরপাক খাচ্ছি। আশেপাশে দেখা কিংবা শ্রীলংকান স্টেশনের জীবন কেমন হয়, দেখার আগ্রহ উবে গেছে। আমার সকল কৌতুহল তখন টুকটুক ড্রাইভারের দিকে। টিকিট কাউন্টার ছেড়ে দুজনেই প্ল্যাটফর্মের দিকে এগোচ্ছি। এর ফাকে সে আমার কাছ থেকে ব্যাকপ্যাকটা নিয়ে নিয়েছে। আমি হ্যান্ডব্যাগটা সামলে ধরে তার পিছন পিছন এগোচ্ছি। একসময় ওভার ব্রিজে উঠে পড়লাম দু জনেই। ভিষণ ভীড়।

মাঝে মধ্যে ধাক্কা খেতে খেতে আমার আর টুকটুক ড্রাইভারের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। আমি টটস্থ হয়ে পড়ছি তাকে হারানোর। কারণ তার ফোন নাম্বারটা আমার নেয়া ছিল না। তারপর আমার ব্যাকপ্যাক এবং টিকেট তার হাতে। আমি চেষ্টা করছি যথা সম্ভব দূরত্ব কমিয়ে তার গা ঘেঁষে চলতে। একটা বিষয় ইতমধ্যে লক্ষ্য করলাম, ধাক্কা খাচ্ছি ঠিকই কিন্তু কোন ধাক্কাই ইচ্চাকৃত দেয়া নয়। যেটা আমরা মেয়েরা মাত্রই বুঝতে পারি। এখানে বাংলাদেশে যে গায়ে ধাক্কাটা আমরা হরহামেশাই খাই।

এভাবে চলতে চলতে দ্বিতীয় প্ল্যাটফর্মে এসে পড়লাম। ভিড়ও একদম হালকা হয়ে গেছে। আমাকে একটা জায়গায় বসিয়ে দিয়ে আমার হাতে টিকিট আর ব্যাকপ্যাকটি দিয়ে সে বিদায় নিল। বিদায় বেলায় সেই সরল হাসি। আমি ততক্ষণে মনে মনে লজ্জায় ন্যুয়ে পড়েছি তাকে চোর অথবা ছিনতাই কারী ভাবায়। আমি প্রচন্ড রকম কৃতজ্ঞতা নিয়ে তাকেও অকৃত্রিম হাসি দিয়ে বিদায় দিলাম।

কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলাম তার চলে যাওয়ার পথে। খুব দ্রুত সে হাঁটার চেষ্টা করছে। মনে পড়ল তার টুকটুকটা রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়েই সে আমাক সাহায্য করার জন্যে পিছু পিছু ছুটেছিল। অদ্ভুত এক অনুভুতি খেলে গেল মনের ভিতর। কৃতজ্ঞতা আর ভালবাসা অনুভব করলাম ড্রাইভারটির প্রতি আর সেই দেশটির প্রতি। অনেক শুনে এসেছি সেদেশর মানুষের কথা, তাদের সহজ সরলতার কথা, তাদের আন্তরিক স্বাগত হাসির কথা, সহযোগিতার কথা।

আজ যেন নিজেই সেরকম একটা অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে গেলাম। কিন্তু আমার তখনও ফার্স্টক্লাশের ৩০০ আর ১১০০ টাকার পার্থক্য মাথায় কাজ করছে না। ফার্স্টক্লাশের পরে প্রিমিয়াম ক্লাশ হতে পারে। কিন্ত সেকি ৮০০ রুপির পার্থক্য? নাহ! কিছুতেই মেলাতে পারছি না।

আমি বসে থাকলাম ট্রেনের অপেক্ষায়।যথাসময়ে ট্রেন এসে থামল। সবগুলো বগিতে ভীড়ের ঠেলাঠেলি। আমার যে বগিটি সেটার গেটে দেখলাম শুধু সাদাদের উপস্থিতি। আমার কৌতূহলের অবসান তখনও হয় নাই। ভিতরে উঠে আমার চোখ ছানাবড়া। রীতিমত প্লেন। তার চেয়েও বেশী। সিটগুলো অনেক চওড়া। আরামদায়ক। নীচে মেঝেতে কার্পেট বিছানো। সামনে বড় পর্দার টেলিভিশন। এক কর্নারে কফিশপ।

বেয়ারার সাদা পোষাকে মাথায় টুপি দেয়া কাউন্টারে লোক অনবরত এটা সেটা বানিয়ে চলেছে। নানাপদের খাবার। চারপাশে তাকিয়ে দেখি একমাত্র আমি শ্যামলা রঙের। বাকিরা সাদা। বুঝতে পারলাম এদের সবাই হয় ইউরোপ অথবা আমেরিকা থেকে আগত। সবাই ফ্যামিলি ট্যুর কিংবা হানিমুন, দু একজন আমার মত একা। চোখাচোখি হতেই তাদেরও সেই হ্যালো সুচক হাসি।

এক ফাকে ওয়াসরুমে গিয়েও হতভম্ভ। প্লেনের ওয়াসরুমের মত, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। আমার ১১০০ টাকার টিকেটের কৌতুহল এতক্ষনে দূর হল। এই কামরাটি বিশেষভাবে টুরিস্টদের জন্যে তৈরি। সাধারণ শ্রীলঙ্কানরা এটাতে ভ্রমণ করে না। তাই এই দামের পার্থক্য। মনে মনে টুকটুক ড্রাইভারকে ধন্যবাদ দিলাম। সাথে আবারও সেই কৃতজ্ঞতাবোধ। বুঝলাম এদেশের মানুষ অতিথির খেয়াল রাখে প্রিয় জনের মতই।

ট্রেন চলতে থাকল সমুদ্রের তটরেখা ঘেঁষে। আমি যে পাশটায় বসেছি সেটা সমুদ্রের দিকে। এক পাশে নীল বিস্তৃত সমুদ্র। বড় বড় ঢেঊ। জানালার কাচের ভিতর দিয়ে দেখে মন ভরছে। ভিতরে একটা ছটফটানি শুরু হয়ে গেছে, কখন ট্রেন থেকে নামব। স্টেশন গুলোর ভিতর দূরত্ব খুব বেশী নয়। ৩০/৪০ মিনিট পরে পরেই ট্রেন থামতে শুরু করল। বেশ কয়েকবার মনে হল সামনের স্টেশনেই নেমে যাই। হোটেল বুকিং দেয়া নাই। তাই নেমে যেতে অসুবিধা নেই। একবার নেমেও পড়লাম হিক্কাডুয়া স্টেশনে। আবার কি মনে হল উঠে পড়লাম ট্রেনে, টিকেট যেহেতু শেষ স্টেশন অব্দি।

একেই বোধহয় বলে ঘরছাড়া। কোন নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। যেখানে মন চায় সেখানে চলে যাওয়া। আবার সিটে এসে বসে সিদ্ধান্ত নিলাম গ্যলেই যাব। পাশের সিটটিতে বসেছে এক বয়স্ক লোক। সিটে বসেই ঘুমে বিভোর।আলাপের সুযোগ নেই। অগত্যা নিজের ভিতর ডুব দেয়াই একমাত্র পথ। আনমনে জানালার কাচ দিয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ে দৃষ্টি মেলিয়ে দিলাম। প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা পর ট্রেন গ্যলে এসে থামল। লোকজন খুব কম। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, দোকানপাট নেই বললেই চলে, খোলামেলা।
ততক্ষনে সুর্য আকাশে দুপুরের দিকে গড়াচ্ছে। কয়েকজন সাদার পিছু নিয়ে আমি স্টেশন থেকে বের হয়ে এলাম। প্রায় সবারই গন্তব্য নির্দিষ্ট। শুধু আমি জানি না কোথায় যাব। কেমন একা একা লাগছে। কি করতে চাই তাও জানিনা। হঠাৎ যেন নিজেকে পেয়ে গেলাম। যা করতে ইচ্ছে করে তাই করব ঠিক করলাম। একটা টুকটুকওয়ালার দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম গ্যল ফোর্টে নিয়ে যেতে। ভাড়া মিটানোর দরকার পড়ল না, মিটার আছে।

টুকটুক ফোর্টের দিকে যাচ্ছে। আমি টুকটুকের ভিতর দিয়ে বাইরে গ্যল দেখছি। কেমন ছিমছাম শহর। মাঝে মাঝে আমাদের ক্রিকেটারা সম্ভবত এখানে আসে ক্রিকেট খেলতে। গ্যল ফোর্টের পাশেই সেই ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি। ফোর্টে পৌছেই উচু দেয়ালটির উপর দাঁড়িয়ে গেলাম। অনেক নীচে সাগরের জল ঠিকরে পড়ছে ফোর্টের দেয়ালে। দেয়াল ঘেষে অনেক বড় বড় পাথর স্তুপিকৃত। সেখানে ঢেউ গুলো আছড়ে পড়ে সাদা ফেনায় রূপ নিচ্ছে, আবার সাগরে মিশে যাচ্ছে। এই খেলা অনবরত।

কয়শো বছর ধরে এই ফোর্ট দাঁড়িয়ে আছে জানিনা, গুগল করে নিতে হবে। আমি ফোর্টের ওয়ালে দাঁড়িয়ে দুরের আকাশে চোখ রাখার চেষ্টা করছি। দিগন্তের শেষ সীমায় আকাশ মিশে গেছে সাগরের জলে। আমার দৃষ্টি সেখানে আটকে গেছে। কানে ভেসে আসছে বড় বড় ঢেউয়ের গর্জন। ঢেউ গুলো ঠিক আমাদের কক্সবাজারের মত নয়। আরো বড় বড়। আশে পাশে সব টুরিস্টদের ভিড়। বেশির ভাগই ছবি তোলায় ব্যস্ত। তখনও সেল্ফির যুগ শুরু হয় নাই। সবাই পোর্ট্রেট ছবি তোলায় ব্যস্ত পিছনে সমুদ্রকে রেখে, কখনও বা ফোর্টকে পিছনে রেখে। আমি নিজেও কয়েকটা ল্যান্ডস্কেপ নিলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম এই শহরটাই ঘুরে ফিরে দেখব সন্ধি অব্দি। এর পরে ভাবা যাবে কোথায় ঘুমাবো। ফোর্টের উপর থেকে নেমে ধীরে ধীরে টুকটুক গুলোর দিকে এগোচ্ছি। হঠাৎ দেখি আমার সেই টুকটুকওয়ালা যাকে স্টেশন থেকে নিয়ে এসেছিলাম। আমাকে দেখেই একখান হাসি। হাসি বলতে “স্মাইল” ইংরেজিতে যাকে বোঝায়। আমি কোন কথা না বলেই তার টুকটুকে উঠে পড়লাম।

এবার সে জিজ্ঞাসা করল আমার হোটেল কোথায়? আমি বললাম এখনও ঠিক করিনি। তবে এখন কোন একটা সৈকতে যেতে চাই যেখানে গিয়ে স্নান করা যাবে। লোকটার সাথে দুএকটা কথা বলেই মনে হল আমার কলম্বোর ড্রাইভারের মতই হবে। দেখাতে বেশ সুঠাম, হাসিমাখা মুখ সব কথাতেই। আমার ততক্ষনে শ্রীলঙ্কানদের সন্দেহ করার বাতিক উবে গেছে। টুকটুক কিছুক্ষণ বড় রাস্তা থেকে গলির রাস্তাত ঢুকে গেছে। পাশ দিয়ে দেখছি সাদা ছেলে মেয়ে মাঝে মাঝে মোটর সাইকেল নিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করতেই জানতে পারলাম এগুলো ভাড়াতে পাওয়া যায়। আমি চাইলেও সে জোগাড় করে দিতে পারে। তাতে নিজের মত শহর ঘুরে দেখতে সুবিধা হয়। আমি কোনরকম মন্তব্য না জানিয়ে চুপ করে থাকলাম। মনে মনে ভিষণ ইচ্ছে হল একটা মোটরসাইকেল ভাড়া নেই, পুরোনো অভ্যাসটা আবার ঝালাই করে নেয়া যাবে।

যাহোক, তখনও আমি সমুদ্রস্নানের বিষয়ে বেশী মনযোগি। কিছুক্ষণ গলির রাস্তায় চলে টুকটুক এসে থামল একটা ছোট্ট বিচ সাইড রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্ট বলতে একখানা রাম্নার ঘর আর সাথে লাগোয়া খাবার যায়গা, চারপাশ খোলা, উপরে রংগীন টিনের ছাউনি। প্লাস্টিকের রংগীন চেয়ার টেবিল পাতা। এক কর্নারে বিল কাউন্টার, তার পিছনে ঝুলছে যীশু খ্রীস্টের মাঝারী সাইজের একখান ছবি। রেস্টুরেন্টে কেউ নেই! আমি একটা টেবিলে গিয়ে আমার ব্যাকপেক রেখে বসে পড়লাম কোন কিছু না ভেবেই। সামনে খোলা আকাশ আর বিশাল বিশাল ঢেইয়ের মেলা।

আমার পিছন পিছন টুকটুক ড্রাইভারও ঢুকল। পাশের কামরা থেকে স্কার্ট পরিহিতা একজন মোটাসোটা মহিলা বেরিয়ে এল। অদ্ভুত এক হাসিমাখা মুখ। সেই মিষ্টি হাসি এখনও আমার চোখে ভাসে। নাম তার টিনা, মাঝ বয়সী। শ্রীলঙ্কাতে একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম, নাম শুনে যেগুলো বুঝি সেগুলো হয় মুসলিম, খ্রিস্টান অথবা হিন্দু। যাদের নাম বুঝিনা সেগুলো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের খুব সুন্দর এক সহাবস্থানের দেশ।

টিনা এসে আমাকে একদম আপন করে নিল। ডাইভার আর টিনার সিংহলিয়া ভাষায় কথপোকথন চলল কয়েক মিনিট। যা পরে জানলাম তা হলো, আমি বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি, একা, আমি থাকব কিছুক্ষণ এই ওনাউয়াটুনা বিচে। এর পর যদি আমি এখানে রাত্রী থাকতে চাই তবে পাশেই একটা ভাল হোটেলে থাকার ব্যাবস্থা করে দিবে। আর বিকালে কোথাও ঘুরতে যেতে চাইলে আমাকে সে এসে আবার নিয়ে যাবে। ততক্ষনে সূর্য এসে মাথার উপর বরাবর আকাশে। শ্রীলঙ্কা নাতিশীতোষ্ণ দেশ হওয়ায় সমুদ্রের কাছাকাছি স্থানগুলোতে তাপমাত্রা ২৭-২৯ এর ভিতর উঠা নামা করে। গরম সেভাবে বোঝা যায়না। এরকম চলে সারাবছর। এখানে শীতকাল নেই। কারো ঘরে বাক্সতে কম্বল অথবা সোয়েটার খুজে পাওয়া যাবে না।

টিনার সাথে সাথে তার স্বামীও চলে এল আমার টেবিলে। দুজনেই আমি বাংলাদেশী জেনে ভিষণ খুশি। অতঃপর টুকটুক ড্রাইভার আমাকে টিনাদের জিম্মায় রেখে বিদায় নিল। সামনে অনেকগুলো ডিভান সাজানো, সব কয়টাতে সাদা পুরুষ মহিলা সমুদ্র স্নানের পোশাকে। কেউ বালিতে চাদর বিছিয়ে রৌদ্র স্নান করছে, কেউ ডিভানে শুয়ে বই পড়ছে, কেউ গায়ে স্নান ব্লক লাগাচ্ছে। কেউ সমুদ্রে নামার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আমি কিছুক্ষণ বসে চারপাশ টা বোঝার চেষ্টা করছি। পরে আমার ব্যাগ ফোন সব কিছু টিনার জিম্মায় রেখে সমুদ্রের কাছে গেলাম। সামনে বিশাল বিশাল ঢেউ। বিশাল বলে ঠিক এর বিশালতা বোঝানো যাচ্ছে না। রীতিমতো ছোট খাট এক একটা টিলার সমান। আমার ভয়ে কম্মসারা।

এক একটা ঢেউ আসছে, পানিতে থাকা লোকজনকে একদম উচুতে তুলে আবার কোন তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর এক একজন ভেসে উঠছে। আমার কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটার সমুদ্রস্নানের অভিজ্ঞতা ওখানে নস্যি। একদম ভয়ে কুকরে গেলাম। একেতো একা, কোন হোটেলেও উঠিনি। এ অবস্থায় বাই চান্স সলিল সধাধি হলে অজ্ঞাত শ্রীলঙ্কানের সমুদ্র জলে মৃত্যু নামক স্থানীয় পত্রিকায় আসতে পারি, কারণ আমার সাথে শ্রীলঙ্কার লোকেদের চেহারায় মিল। এ অবস্থায় প্রায় আধা ঘন্টা কেটে গেল তীরে বসেই অন্যদের সমুদ্র স্নান দেখে। এ বিচে সবাই বিদেশি। একটু ফাকে পাশের বিচে সব লোকালদের ভিড়।

বুঝলাম, কলম্বোর ড্রাইভারের মত এখানকার ড্রাইভারও আমাকে টুরিস্ট হিসাবেই বিদেশিদের জন্যে ব্যাবহৃত বিচে এনেছে। একটা বিষয় বুঝলাম, শুধু শ্রীলঙ্কান সরকার নয়, সাধারণ মানুষও এখানে টুরিস্টদের বিষয়য়ে সচেতন। আমাদের কক্সবাজার কিংবা অন্যান্য জায়গায় যা আমরা কখনও দেখিনা। যাহোক, এভাবে বসে বসে সাহস সঞ্চার করে দেখে নিলাম কিভাবে সাদা গুলো নিজেকে সামলাচ্ছে এরকম দানবাকৃতির ঢেউ গুলোর ভিতর। শেষে সাহস করে নেমে পড়লাম। আহ! আমার সমুদ্র স্নান!

স্নান শেষে টেবিলে এসে বসতেই যেন রাজ্যের ক্ষুধা এসে ভর করল আমার পেটে। একে বারে চুই চুই অবস্থা। টিনা এক প্লেট ফ্রায়েড রাইস সাথে টুনা ফিস ফ্রাই দিয়ে গেল। আহ, ক্ষুধা পেটে এ যেন অমৃত। আজো যেন লেগে আছে সে স্বাদ। শরীর তখন বেশ শ্রান্ত। টিনা একটা ডিভান সাদাদের সরিয়ে আমাকে দেখিয়ে দিল বসার জন্যে। ওটাতে গা এলিয়ে দিলাম। বোধহয় কিছুক্ষণের জন্যে ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। যখন উঠালাম দেখি টিনা একটা কমলা রঙের ডাব হাতে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে। আহ, এরকম পড়ন্ত বিকেলে ডাবের জল, কি তৃপ্তি!

টিনার সাথে গল্পে গল্পে বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। অনেক কিছু জানছি। কিভাবে সুনামীর সময় সবাই দৌড়ে পালিয়ে বেচেছিল, কিভাবে, তাদের এই রেস্টুরেন্ট কিভাবে চলে, তার সংসার ছেলেমেয়ে, অনেক কিছু। রাতের জন্যে তখনও হোটেল বুকিং দেয়া হয় নাই। টিনাকে বললাম হিক্কাডুয়া ট্রেন থেকে নেমে গিয়েছিলাম। এ কথা শুনতেই বলল হিক্কাডুয়া অনেক সুন্দর জায়গা। অনেক হোটেল, অনেক লোক, সার্ফিং, ট্রাটেল খামার, স্নরকেলিং।

এগুলো শুনতেই মন চঞ্চল হয়ে উঠল। সন্ধ্যার আগে আগেই টুকটুক ড্রাইভারকে ডেকে টিনার আর তার স্বামীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাস স্যান্ডে গিয়ে ছুটলাম হিক্কাডুয়া। আহ! কত স্মৃতি!

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে