নদীর নাম কীর্তনখোলা

0
24

কীর্তনখোলা এ শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উজ্জ্বল নারীর মতো এক নদীর দৃশ্য ভেসে ওঠে চোখের সামনে। এই নদীর সঙ্গে বরিশালের মানুষের নাড়ির সম্পর্ক বিদ্যমান। কীর্তনখোলা আর বরিশালের মানুষ যেন এক সুতায় গাঁথা। একটি বাদে অপরটি চলে না। বরিশাল আর কীর্তনখোলা এ যেন অবিচ্ছেদ্য।

কীর্তনখোলা এমনই এক নদী, যে নদী নিয়ে প্রচুর কবিতা, গান লেখা হয়েছে। বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করেছেন, বড় হয়েছেন কিন্তু কীর্তনখোলার জলে স্নান করেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। বরিশালের মানুষ যারা দূর-দূরানত্মে থাকেন, তাদের কাছে এই নদী এক স্মৃতি বিলাস। দেশ বিভাগের পর যারা বরিশাল ছেড়ে ভারতের বিভিন্ন প্রানত্মে বসতি স্থাপন করেছেন, তাঁরাও বরিশালের মানুষের দেখা পেলে এই নদী সম্পর্কে খোঁজখবর জানাতে চান। বস্তুত কীর্তনখোলা শব্দটি বরিশালের মানুষের জীবনের সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে গেছে। কিন্তু কীর্তনখোলা আজ বিপন্ন। বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে চর। প্রায়শ লঞ্চ আটকে পড়ে। জেগে ওঠা চর নিয়ে শুরম্ন হয়েছে তুঘলকি কা-। যে যেভাবে পারছে কীর্তনখোলা দখল করে নিচ্ছে।

কীর্তনখোলা নদীর নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানান রহস্য। সরকারী কাগজপত্রে এই নদীর নাম কখনই কীর্তনখোলা স্বীকার করা হয়নি। সিএস ও আরএস খতিয়ান ও অন্যান্য ম্যাপে নদীর নাম বলা হয়েছে বরিশাল নদী। বরিশালের ইতিহাস লেখক এক সময়ের ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরেট হেনরি বেভারিজ এই কথায়ই বলেছেন, তিনি তাঁর দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব বাকেরগঞ্জ, ইটস হিস্ট্রি এ্যান্ড স্ট্যাটিকস গ্রন্থে লিখেছেন, জেলার সবচেয়ে বড় শহর বরিশাল এবং এখানে প্রধান আদালতগুলো অবস্থিত।

বরিশাল নদীর পশ্চিম তীরে এর অবস্থান। তিনি আবার ফুটনোট দিয়ে লিখেছেন, আমি বিশ্বাস করি, নদীর প্রকৃত নাম কীর্তনখোলা। কিন্তু এ নাম কখনও উচ্চারিত হতে শুনিনি। পরবর্তী ইতিহাস লেখকরা একথাই বলে গেছেন। জেলার যেসব সার্ভে ম্যাপ রয়েছে, সেখানে কীর্তনখোলা নদীর অসত্মিত্বের কথা স্বীকার করা হয়নি। বলা হয়েছে, বরিশাল নদী।

স্থানীয়ভাবে নদীর নামকরণ নিয়ে দু/তিনটি বক্তব্য শোনা যায়। নদীর পার ঘেঁষেই শহরের সবচেয়ে পুরনো হাট রয়েছে। প্রচলিত রয়েছে, সেখানে কীর্তনের উৎসব হতো। সেই থেকে এই নদীর নাম হয়েছে কীর্তনখোলা। কেউ কেউ হাটখোলায় স্থায়ীভাবে কীর্তনের দল বসবাস করার কারণে এর নাম কীর্তনখোলা হয়েছে বলে মনে করেন। তবে নদীর নামকরণের সঙ্গে কীর্তনের কিংবা কীর্তনীয়দের যে একটা সম্পর্ক রয়েছে তা নিশ্চিত। কৃষ্ণলীলার কাহিনী নিয়ে কীর্তনীয়রা গানে মেতে থাকতেন। কৃষ্ণ রাধাকে নিয়ে যমুনা নদীতে লীলায় মেতে উঠতেন।

বরিশালে যমুনা না থাকলেও কীর্তনখোলা নদীই যেন রাধা-কৃষ্ণের অমর প্রেমের গাথা হয়ে আছে। কীর্তনখোলা মূলত আড়িয়াল খাঁ নদের একটি শাখা। আড়িয়াল খাঁর উৎপত্তি পদ্মা থেকে। বরিশাল ঘেঁষে কীর্তনখোলা নদী পশ্চিমে এগিয়ে নলছিটি থানার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। সেই সঙ্গে পরিচিতি পেয়েছে নাম। একটি অংশ ধানসিড়ি নাম নিয়ে কচা নদীতে গিয়ে মিশেছে। অপর অংশ মিলেছে বিষখালী নদীতে। দেিণ কীর্তনখোলা রানীহাট বাকেরগঞ্জ গিয়ে মিশেছে। কীর্তনখোলা নদীতে ব্রিটিশ স্টিমার কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাহাজ। রবীন্দ্রনাথ সেই জাহাজে করে বরিশালে এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ পানসীঘাটে পানসীতে রাতযাপন করেন।

কীর্তনখোলার বুকে সে সময় জমিদারদের পানসী ভাসত নানান চমক নিয়ে। জাতীয় কবি কাজী নজরম্নল ইসলাম কীর্তনখোলার বুকে পদচিহ্ন এঁকে ছিলেন। কীর্তনখোলা নদীর কারণে বরিশাল এক অপূর্ব শহর হয়ে উঠেছিল। কীর্তনখোলা নদীর ভাঙ্গন থেকে শহর রা করার জন্য ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর মি. বেট্রি শহর রা বাঁধ নির্মাণ করেছিলেন। জোটের আমলে নামকায়াসত্মে শহর রা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ওই নির্মাণ কাজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ব্রিটিশ সরকার এমনকি পাকিসত্মান সরকারের প্রথমদিকে শহর রা বাঁধের নদীর পাড়ে কোন ধরনের নির্মাণকাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছি সৌন্দর্য রার্থে। কিন্তু কীর্তনখোলার সেই যৌবন হারিয়ে গেছে।

জীবনানন্দ দাশ, মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের বরিশালের নদী কীর্তনখোলা এখন সব হারিয়ে বৈধব্য গ্রহণ করেছে। বরিশাল প্রেসকাবের সভাপতি এস এম ইকবাল বলেছেন, বান্দ রোডের পাশে ছোট ছোট বেঞ্চি ছিল। সেখানে বসে নদী দেখা যেত। নদী ছুঁয়ে ছিল বান্দ রোড। কিন্তু সেখান থেকে নদী ছুঁয়ে গেছে কয়েক শ’ গজ দূরে। যেখানে এক সময় নদী ছিল, সেখানে এখন চর জেগেছে। লেডিস পার্ক, খাদ্যগুদাম, এলজিডি ভবন, বিনোদন রেসত্মরাঁ, খেয়াঘাট, মৎস্য মার্কেট, ইসলামী হাসপাতাল, স্টেডিয়াম। অব্যাহত পলি ভরাটের কারণে নদীর বুকে জেগে উঠেছে বিশাল চর। এক সময় অহরহ জাহাজ চলাচল করত কীর্তনখোলায়। কিন্তু আজ লঞ্চ চলাচল করা বড় কষ্টকর।

আশির দশকের শুরম্নতে ১৯৮৩ সালে একদল পানি বিশেষজ্ঞ কীর্তনখোলা নদীর ভাঙ্গন রোধ এবং নদীর নাব্য রায় কিছু সুনির্দিষ্ট প্রসত্মাব দিয়েছিলেন। কীর্তনখোলার অপর তীরের গ্রাম চরকাউয়ার ভাঙ্গন রোধ, নদীর নাব্য ইত্যাদি বিষয়ে পানি বিশেষজ্ঞ দল বরিশাল সফর করে। তারা চরকাউয়া এবং নদীর জেগে ওঠা বিশাল চরটি পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট পেশ করে। বরিশাল ত্যাগের আগে ওই সদস্যরা সুশীল সমাজ তথা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, কীর্তনখোলা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মাধ্যমে বরিশাল শহরের দিকে চরপাড়া এবং চরকাউয়ার ভাঙ্গন রোধ সম্ভব।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে