পোশাক শ্রমিকরা আবার নতুন সংকটে

0
64

ঢাকায় ফিরে নতুন সংকটে পড়েছেন তৈরি পোশাক শ্রমিকরা৷ করোনা আতঙ্কে বাড়িওয়ালার তাদের বাসায় উঠতে দিচ্ছেন না৷ রবিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত অনেক পোশাক শ্রমিক বাইরে অপেক্ষা করছিলেন৷ আর হাতে টাকাও নেই যে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাবেন৷

পোশাক শ্রমিকদের রোববার (৫ এপ্রিল) কাজে যোগ দেয়ার নির্দেশ ছিল৷ আর কাজে যোগ না দিলে তারা বেতন পাবেন না এটাই ছিল নির্দেশনা৷ তাই যারা ২৬ মার্চ থেকে ছুটি পেয়ে বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন তাদের প্রায় সবাই ট্রাকে, পায়ে হেঁটে বা যেকোনো উপায়ে ঢাকা, সাভার ও গাজীপুরে ফিরে আসেন৷ কিন্তু রোববার সকালে কারখানায় গিয়ে জানতে পারেন ১২ তারিখ পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়েছে৷ গেট বন্ধ৷ সকালে ঢাকার মিরপুর ও সাভার এলাকায় মাইকিং করে ছুটি বাড়ানোর ঘোষণা দিতে শোনা গেছে৷ পুলিশ মোতায়েন করা হয় বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে, যাতে বিশৃঙ্খলা না হয়৷ এর মধ্যেই আবার মিরপুরের কয়েকটি পোশাক কারখানায় আধাবেলা কাজও হয়৷ সেরকম একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক আব্দুল হাকিম বলেন, ‘‘ভোরে এসেছি৷ বাসায় ঢুকতে পারিনি৷ বাড়িওয়ালা বলেছেন তোমরা করোনা আক্রান্ত কিনা জানিনা৷ তাই বাসায় ঢুকতে না পেরে গার্মেন্টস-এ চলে আসি৷ আধাবেলা কাজ করিয়ে আমাদের বলা হয় ১২ তারিখ পর্যন্ত ছুটি৷ কবে বেতন দেবে তাও জানায়নি৷ আমার বাড়ি বরিশাল৷ অনেক কষ্ট করে এসেছি৷ এখন বাড়ি কিভাবে যাব জানিনা৷ টাকা পয়সাও নেই৷”

সাভারে ডেনিটেক গার্মেন্টস-এর কর্মী তসলিমা অক্তার বলেন, ‘‘ছুটি পেয়ে আমাদের গ্রামের বাড়ি রাজশাহী গিয়েছিলাম৷ আমাদের জানানো হয়েছে ৫ তারিখ গার্মেন্টস খোলা৷ অনেক কষ্টে আড়াই হাজার টাকা খরচ করে এসেছি৷ না আসলে বেতন দেয়া হবেনা বলা হয়েছে৷ আসার পর দেখি ছুটি ১২ তারিখ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে৷ কিন্তু আমরা কিভাবে বাড়ি যাব৷ বাস বন্ধ, হাতে টাকাও নেই৷ আমাদের বেতনও দেয়নি৷”

তাসলিমাসহ আরো ১০ জন সাভারের গেন্ডা এলাকায় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তাদের বাসার সামনে অপেক্ষা করছিলেন৷ তাদের বাড়িওয়ালা জানিয়ে দিয়েছে বাসায় উঠতে দেবেন না৷ তার আশঙ্কা এই পোশাক শ্রমিকরা যদি করোনা আক্রান্ত হন তাহলে আর সবাই আক্রান্ত হবেন৷ তাসলিমা বলেন, ‘‘বাড়িও ফিরতে পারছিনা বাসায়ও ঢুকতে পারছিনা৷ আমাদের এখন রাস্তায় থাকা ছাড়া গতি দেখছিনা৷ আগে যদি আমাদের এই ছুটির কথা জানানো হতো তাহলে আমরা এই বিপদে পরতাম না৷ আমাদের দেখার কেউ নেই৷”

রিক্তা বেগম কাজ করেন স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস-এ৷ তিনি তার গ্রামের বাড়ি খুলনা থেকে ট্রাকে করে এসেছেন৷ গেন্ডার একই বাসায় তিনিও থাকেন৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা ১০ জন একসাথে থাকি৷ কেউই বাসায় ঢুকতে পারছিনা৷ বাড়ি ওয়ালার সাথে তর্ক করেও লাভ হচ্ছেনা৷ এখন যে আমাদের কী হবে কিছুই বুঝতে পারছিনা৷”

এদিকে এই অবস্থার মধ্যেও পোশাক কারখানায় লে অফ এবং শ্রমিক ছাঁটাই অব্যাহত আছে বলে দাবী করেছেন শ্রমিক নেতারা৷ তারা অভিযোগ করেন, চাকরি যাবে এবং বেতন দেয়া হবেনা এই ভয় দেখিয়ে শ্রমিকদের ঢাকায় আনা হয়েছে৷ আসলে পোশাক কারখানার মালিকরা সরকারকে চাপে ফেলে বেশি সুবিধা আদায়ের জন্য শ্রমিকদের করোনার মধ্যে মাঠে নামাচ্ছেন৷ এটা অমানবিক৷ এই মালিকরাই সকারের কাছ থেকে বেশি সুবিধা নিয়েছেন৷

গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুরকদার বলেন, ‘‘সরকার ও বিজিএমইএ কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেনা৷ এই লাখ লাখ শ্রমিককে তারা করোনার মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন৷ আর তারা যদি ১২ তারিখের পরও কারখানা চালু করেন তাহলেও তাদের পক্ষে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়৷”

তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘আমাদের কাছে খবর আছে এরইমধ্যে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিক ছাটাই করা হচ্ছে৷ আর কারখানা লে অফ করা হচ্ছে শ্রমিকদের সুবিধা না দেয়ার জন্য৷”

তবে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি এবং এফবিসিসিআই’র সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমার এইসব অভিযোগ অস্বীকার করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা পোশাক শ্রমিকদের বাড়িও যেতে বলিনি আবার আসতেও বলিনি৷ তাদের ছুটিতে যার যার কারখানার পারে আবাসস্থলেই থাকতে বলা হয়েছিল৷ তারা নিজেরাই বাড়ি গেছেন৷ আবার নিজেরাই ফিরে গেছেন৷ আমাদের কী করার আছে৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘পোশাক শ্রমিকরা বেতন পাবেন, আতঙ্কের কিছু নেই৷”আর সরকারের তরফে বলা হয়েছে এই মাসের শেষ সপ্তাহে পোশাক শ্রমিকরা বেতন পাবেন৷

এদিকে, পুলিশ ঢাকায় প্রবেশ এবং ঢাকা থেকে বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে শনিবার৷

পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা জানান, ‘‘জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি এবং যানবাহন ছাড়া আর কেউ ঢাকায় প্রবেশ ও ঢাকা থেকে বের হতে পারবেনা৷ করোনায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে৷”ডয়েচে ভেলে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here