নদী খননের নামে পঞ্চগড়ে ১৫০ কোটি টাকায় দায়সারা কাজের আগেই বিল নিচ্ছে ঠিকাদার বাহিনী!

0
288
দেখা হয়েছে
পাথরাজ নদীটির প্রামাণিকপাড়া থেকে শুরু করে ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত অংশজুড়ে দুইবারের কাজ শেষ করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার।

পঞ্চগড় জেলার মৃতপ্রায় নদীগুলোর প্রাণ ফেরাতে পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জেলার পাঁচটি নদী ও একটি খাল খননে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও ঠিকাদারের দায়সারা খননে তা কোনো কাজেই আসছে না। নামমাত্র খননে নদীর প্রশস্ততা যেমন কমেছে তেমনি অপরিকল্পিতভাবে খননের পরপরই আবার তা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ভেস্তে গেলেও পকেট ভরছে ঠিকাদারদের। এ নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয়দের মাঝে।

জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ৬৪ জেলায় অভ্যন্তরের ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় পঞ্চগড়ের পাঁচটি নদী ও একটি খাল পুনঃখননের কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। মোট ১৬টি প্যাকেজে করতোয়া, চাওয়াই, ভেরসা, পাথরাজ, বুড়িতিস্তা ও বড়সিঙ্গিয়া খালের ১৬৪ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ চলছে।

এর মধ্যে বোদা উপজেলার পাথরাজ নদীটির শুরুর অংশের ১২ কিলোমিটার পুনঃখনন শুরু হয় গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি। কাজটি পায় ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাজুল ইসলাম। পরে স্থানীয় ঠিকাদার রাওজুল কারিমকে কাজটির দায়িত্ব দেয় প্রতিষ্ঠানটি। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু করে এক মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করে তারা। দায়সারাভাবে খনন করায় স্থানীয়দের চাপের মুখে পড়ে আবারও চলতি জানুয়ারিতে খনন করতে বাধ্য হয় তারা। কিন্তু আবারও দায়সারাভাবেই কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। ৫০ মিটার প্রশস্ত নদীটি প্রথম দফায় ২০ মিটার আর বর্তমানে ১০ মিটার প্রশস্ততায় পুনঃখনন করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বরাদ্দের তিন কোটি ৯৫ লাখ টাকার বেশির ভাগ বিলই তুলে নিয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সবেমাত্র বোদা উপজেলা সদরের পাথরাজ নদীটির প্রামাণিকপাড়া থেকে শুরু করে ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত অংশজুড়ে দুইবারের কাজ শেষ করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। কাজ শুরুর স্থানে তুলনামূলক বেশি খনন করা হলেও কিছু দূর গিয়ে দেখা মেলে ভিন্ন চিত্র। শুধু নদীর কিনার বরাবর খনন করা হয়েছে। তিন মিটার গভীর খননের কথা থাকলেও এক মিটারের বেশি গভীর খনন করা হয়নি। খননের মাটি ও বালু ফেলা হয়েছে নদীতেই। এ ছাড়া পারের মাটি সমান করে ঘাস ও বৃক্ষরোপণের কথা থাকলেও কোনোটিই নজরে পড়েনি।

স্থানীয়রা জানায়, তাদের বোকা বানিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে খনন করেছে। প্রশস্ত নদীটিকে খনন করে এখন খালে রূপান্তর করছে। এর আগেও নদীর ওই অংশ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পুনঃখনন করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে তিনবারের খননের পরও নদীর রুগ্ণ দশাই রয়ে গেছে। এ অবস্থা শুধু পাথরাজ নদীর নয়, পঞ্চগড়ের পুনঃখনন করা অন্য নদীগুলোরও।

অপরিকল্পিত ও দায়সারাভাবে খনন করায় নদীর সৌন্দর্যহানির পাশাপাশি সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ভেস্তে যাচ্ছে। জলে যাচ্ছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। তবে ঠিকাদারের ঠিকই পকেট ভরছে। ১৬টি প্যাকেজের মধ্যে দু-একটি বাদে সব কাজ পেয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চারটি প্যাকেজে করতোয়া নদীর সাড়ে ২৯ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ করছে চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড। ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এইচবি-এসএসইসিএল জেভি দুটি প্যাকেজে করতোয়া নদীর ১৬ কিলোমিটার, এডিএল-আই-এইচএনটি জেভি দুটি প্যাকেজে করতোয়া নদীর ১৯ কিলোমিটার, এইচবি-নিয়াজ-নোনা জেভি একটি প্যাকেজে সাড়ে সাত কিলোমিটার, শহিদ ব্রাদার্স একটি প্যাকেজে করতোয়া নদীর সাড়ে পাঁচ মিটার আরেকটি প্যাকেজে পাথরাজ নদীর ১৮ কিলোমিটার, মেসার্স তাজুল ইসলাম পাথরাজ নদীর ১২ কিলোমিটার, টাঙ্গাইলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গুডম্যান এন্টারপ্রাইজ একটি প্যাকেজে চাওয়াই নদীর ২০ কিলোমিটার, উন্নয়ন গুডম্যান জেভি একটি প্যাকেজে বুড়িতিস্তা নদীর ২০ কিলোমিটার, রংপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রূপান্তর বড়সিঙ্গিয়া খালের ছয় কিলোমিটার ও ঠাকুরগাঁয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জামাল হোসেন ভেরসা নদীর ১০ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ করছে। কিন্তু তারা কেউ নিজে না করে স্থানীয় ঠিকাদারদের দিয়ে কাজগুলো করে নিচ্ছে। স্থানীয় ঠিকাদাররা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নামমাত্র খনন করেই তুলে নিচ্ছেন বিলের টাকা।

এলাকার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধা তরিকুল আলম বলেন, ‘যেভাবে নদীগুলো খনন করা হচ্ছে তা দায়িত্বজ্ঞানহীন, পরিকল্পনাহীন ও খামখেয়ালিপনা ছাড়া কিছুই নয়। যেসব ঠিকাদার দায়সারাভাবে কাজগুলো করে সরকারের টাকা তুলে নিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

পাথরাজ নদীর পুনঃখনন কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাজুল ইসলামের নিযুক্ত স্থানীয় ঠিকাদার রাওজুল কারিম বলেন, ‘খননের পর পরই বালু এসে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আমার অংশটুকু দুইবার খনন করলাম। এভাবে কাজ করলে আমাদের লোকসান গুনতে হবে।’

পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, ‘নদীর পাশে ব্যক্তিগত জমি থাকায় বেশি দূরে খননের মাটি ও বালু ফেলা যাচ্ছে না। আমরা নিয়মিত কাজগুলো পর্যবেক্ষণ করছি। ডিজাইন অনুযায়ী কাজ না করলে ঠিকাদাররা বিল পাবেন না।

আগের লেখা তিতাস নদী খননের অভাবে বালু চরে পরিণত হয়েছে!
পরের লেখা উলিপুরের বুড়িতিস্তা নদী এখন মরা খাল!
শেয়ার

আপনার মন্তব্য লিখুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন