উলিপুরের বুড়িতিস্তা নদী এখন মরা খাল!

0
76
দেখা হয়েছে

দিল্লুর রহমান : ১.
বুড়িতিস্তা- উলিপুরের বুক চিরে যাওয়া একটি নদী। গবেষকদের মতে তিস্তার প্রাচীন প্রবাহই উলিপুরের ‘বুড়িতিস্তা’। প্রাচীনকাল থেকেই এ নদী এই অঞ্চলের ইতিহাসের নির্ধারক। মোগল আমলে যেমন অসংখ্য নৌযুদ্ধ সংঘঠিত হয়েছে এ নদীর বুকে তেমনি এখানকার কৃষি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির প্রাচুর্যতা উলিপুরকে বানিয়েছে নবাবী আমলের বাহারবন্দ পরগনার প্রশাসনিক কেন্দ্র।

তিস্তা- বুড়িতিস্তা- ব্রহ্মপুত্র এ যেন উলিপুরের আশীর্বাদ ! এখানে উৎপাদিত ধান, পাট, রেশমজাত পণ্য এই বুড়িতিস্তার পথ ধরেই ব্রহ্মপুত্র অতিক্রম করে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ত এই ১৫০ বছর আগেও। বুড়িতিস্তা কেন্দ্রিক উলিপুরের সেই সুদিন আজ নেই। প্রাচীন নামটি ধারণ করলেও বুড়িতিস্তা এখন পরিণত হয়েছে খালে। সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ড খননের নামে এ নদীর খালে রূপান্তর চূড়ান্ত করে দিয়েছে। নদী কি করে খাল হয়?

২.
১৭৮৭ সালের আগ পর্যন্ত তিস্তার মোট প্রবাহের ১০ ভাগ পানি বহন করে রংপুর জেলার কাউনিয়া হয়ে কুড়িগ্রামের রাজারহাট দিয়ে উলিপুর উপজেলার বুক চিরে চিলমারীর রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের কাঁচকোল গ্রামে এসে ব্রহ্মপুত্রে পতিত হয় এ নদী। ১৭৮৭ এর মহাপ্লাবন ও ১৮৯৭ এর ভূমিকম্পে বড় ধরনের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বুড়িতিস্তার স্রোতধারা ক্ষীণ হয়ে আসে বটে কিন্তু প্রশস্ত নদীর বুক অতীতের সাক্ষী হয়ে ছিল আরও বহুদিন।

বুড়িতিস্তার উলিপুরে প্রবাহমুখ থেতরাই অংশে ১৯৭২-৭৩ সালে নির্মিত স্লুইসগেট ‘৮৮ এর বন্যায় ভেসে গেলে সড়ক বানিয়ে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় নদীর প্রবাহ। নদীর খালে পরিণত হওয়ার শুরু তখন থেকেই। এরপর শুরু হয় প্রভাবশালীদের দখল উৎসব। উলিপুর গুনাইগাছ ব্রীজের কাছে নদীর জমি ভরাট করে গড়ে তোলা হয় বিপণীবিতান, কিন্ডারগার্টেন স্কুল, মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠান। নদী দখল হবে এই যেন স্বাভাবিক এদেশে! আবার যখন দখলদাররা নদীর জমির মালিকানা দাবী করে সরকারি দলিলসূত্রে তখন যেন অবাক হবার ভাষাও থাকে না। নদী কি আমাদের প্রতিপক্ষ ?

৩.
বাঙালি নদীর সন্তান। তাই নদী মাতার দুর্দশা তার সহ্য হয়নি। স্থানীয় পরিবেশ সচেতন মানুষ ও রেল-নৌ,যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি ২০১৭ সালে গড়ে তুললেন এক দুর্বার আন্দোলন। স্লোগান ধরলেন বুড়িতিস্তাকে বাঁচাতে হবে। এই আন্দোলনের ফলে ২০১৯ এই শুরু হয় নদী দখলমুক্তকরণ ও খনন কাজ। দুঃখের কথা হলো খননকাজ পুরোপুরি শেষ হলেও নদীর মূল খাত সম্পূর্ণ দখল মুক্ত হয়নি আজও। শুরুতেই আশা ছিল নদী তার আগের রূপ-যৌবন সম্পূর্ণ ফিরে না পেলেও কিছুটাতো পাবেই। নদীতীরের মানুষ অন্তঃত নদীর বিশালতার স্বাদটুকু নিতে পারবে। কিন্তু খননের পর সে আশায় গুড়েবালি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড এ নদীকে খননের নামে যে আকৃতি দিয়েছে তাতে বুড়িতিস্তার সাথে নদী’র চিরায়ত আবেদন বড় বেমানান। এখন বরং বুড়িতিস্তাকে খাল হিসেবেই মানায়। অথচ গত প্রায় তিনদশক আগে এ নদীর খাত শুকনো থাকলেও বিশালতার চিহ্ন ছিল স্পষ্ট। কিন্তু এখন খনন করে পাড় বেঁধে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবেই একে পরিণত করা হয়েছে খালে। নামে নদী হলেও বুড়িতিস্তা এখন ‘নদী নয় খালেই পরিচয়! অথচ খননের দাবিতে যত মানুষ আওয়াজ তুলেছে, নদী যে খাল হলো এ ব্যাপারে ঠিক তত মানুষই নীরব প্রভাবশালী দখলদারের ভয়ে। এ কেমন প্রহসন!

৪.
খননের সময় দেখা গেছে নদী খনন হয়েছে প্রায় ২৪ মিটার চাওড়া করে। তলদেশ থেকে ঢালু করে পাড় বাঁধার কারণে তলদেশের চওড়া হয়েছে প্রায় ১৪ মিটার। গভীরতার তারতম্য ও চলার পথে বাধার দরুন নদীর প্রস্থ সব জায়গায় সমান হয় না। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড একই মাপে খনন করার ফলে নদী হয়েছে দীর্ঘ এক সরু খাল। গুনাইগাছ খেয়ার পাড় ব্রীজসংলগ্ন যে স্থাপনাগুলো নদীর মূল খাতের মধ্যে পড়েছে সেগুলোকে বাদ দিয়েই পাড় বেঁধে দেওয়ায় ব্রীজের চেয়েও নদী হয়েছে ছোট। অথচ তিন বছর আগে নির্মিত বর্তমান ব্রীজটির তুলনায় পুরাতন ব্রীজটি ছিল দৈর্ঘ্যে আরও বড়, নদীর সাথে কিছুটা মাপ ঠিক রেখে। নতুন ব্রীজটিকে ইচ্ছা করেই যেন ছোট করে নদীকে  সংকোচন করা হয়েছে এখানে।

নদী পাড়ের পঞ্চাশোর্ধ কয়েকজন বাসিন্দা জানান  ছোটবেলায় যতদূর পর্যন্ত খাতের বিস্তৃতি তারা দেখেছেন তা আনুমানিক ৬০ মিটার যা বর্তমান খননকৃত মাপ হতে ৩৬ মিটার কম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খ্যাতনামা নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন- ‘ এই বুড়িতিস্তা নদীকে কেন্দ্র করেই বাহারবন্দ তথা উলিপুরের প্রাচীন ইতিহাস আবর্তিত হয়েছে। নদী কেটে খাল বানানো এখানকার ইতিহাস-ঐতিহ্যকেই হত্যার শামিল।’ তিনি কোন কোন স্থানে এ নদীর প্রশস্ততা ১৫০ মিটার পর্যন্ত দেখেছেন বলে জানিয়েছেন।

রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নাহিদ হাসান নলেজ জানান,-“আন্দোলনের শুরুতে পানি উন্নয়ন বোর্ড স্বীকারই করতে চায়নি এটি নদী। আমরা ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন গেজেটিয়ার থেকে প্রমাণ দিয়েছি যে এটি অনেক বড় একটি নদী। এখন একই মাপে খনন করে নদীকে খাল বানানোর যৌক্তিকতা কী বুঝে আসে না।”

আসলেই নদী কি স্কেল মেপে চলে? দুঃখের শেষ এখানেই নয়। বুড়িতিস্তার উলিপুর প্রবেশমুখ থেতরাই অংশে ৮৮ এর বন্যার পর যে সড়ক বানিয়ে এর প্রবাহপথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হলো সেটি এখনও খুলে দেওয়া হয়নি অথচ খননকাজ পুরোপুরি শেষ। ফলে উজানে তিস্তা থেকে পানি আসা এখানে অসম্ভব। আবার বুড়িতিস্তার ব্রহ্মপুত্রে প্রবেশপথ চিলমারী অংশে কোন খনন হয়নি। ফলে উজান-ভাটির কোন টান এ নদীতে নেই। এটি নদী এখন পুরোদস্তুর বৃষ্টির পানি জমা এক বদ্ধ জলাশয়- পৌরসভার ময়লা ফেলা ড্রেন মাত্র। শিব গড়তে বানর- এর থেকে ভাল উদাহরণ আর আছে কোথায়!

৫.
নদী খাল হোক বা ড্রেন হোক তাতে কার কি? এখানে বিনিয়োগ হয়েছে, ব্যায় হয়েছে সুতরাং জিডিপিও বেড়েছে। আর জিডিপির ধাক্কায় পড়ে নদী হারিয়েছে প্রাণ। শুধু কি নদীর প্রাণই গেল- নদী কেন্দ্রিক যে বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হলো তার কি হবে? এর অভিঘাত কি আমাদের সইতে হবে না? এমনিতেই গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে পানির স্তর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নিচে নেমেছে। এর প্রভাব আমরা দেখছি আমাদের সেচব্যবস্থায়। প্রতিবছর যে পরিমাণ সেচ ব্যায় বাড়ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জলসংকট খুবই তীব্র আকার ধারণ করবে। এই জলসংকট ঠেকানো ও বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে বুড়িতিস্তারমতো ছোট- বড় ও বিলুপ্তপ্রায় নদ-নদী, জলাশয়গুলোর পুনরুজ্জীবনের কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু শিব গড়তে যে আমরা বানর গড়লাম তার কি হবে? এ নদী কি আমাদের ক্ষমা করবে?

লেখক : সদস্য, রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি, কুড়িগ্রাম জেলা শাখা।

আপনার মন্তব্য লিখুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন