সিঙ্গাপুরে করোনা ভাইরাসে প্রথম বাংলাদেশি আক্রান্ত

0
61
দেখা হয়েছে

সিঙ্গাপুরে কর্মরত এক বাংলাদেশি প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে সিঙ্গাপুরস্থ বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। খবর দ্য স্ট্রেইট টাইমস।

সিঙ্গাপুরে ৩ জন নতুন করে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ জন বাংলাদেশি এবং অন্য দুজন সিঙ্গাপুরের নাগরিক। তবে ভাইরাসে আক্রান্ত ৩ জনের কেউই চীনে ভ্রমণ করেননি।

নিরাপত্তার স্বার্থে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ওই বাংলাদেশির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তবে এটা জানা গেছে, ৩৯ বছর বয়সী ওই বাংলাদেশি পুরুষ সিঙ্গাপুরে একজন শ্রমিক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এ মুহূর্তে তাকে ন্যাশনাল সেন্টার ফর ইনফেকশাস ডিজিস বা এনসিআইসিডিতে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সিঙ্গাপুরের কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের এক কর্মীর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য আমাদের জানিয়েছেন। নিরাপত্তার খাতিরে ওই বাংলাদেশির পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। আশা করছি, দ্রুতই তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারব। তার স্বাস্থ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে হাইকমিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তার শরীরে অসুস্থতা দেখা দেয়। পরে তাকে ৭ ফেব্রুয়ারি চাঙ্গি জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তি ভাইরাসের লক্ষণ বুঝতে পেরে ৩ ফেব্রুয়ারি সাধারণ একটি ক্লিনিকে যান। ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে যান চেঙ্গি জেনারেল হাসপাতালে।

এরপর ৮ ফেব্রুয়ারি নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে করোনা ভাইরাসে তার আক্রান্তের বিষয়টি চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ইনফেকশাস ডিজিজেস (এনসিআইডি)-এর আইসোলেশন ওয়ার্ডে রয়েছেন।

অসুস্থ হওয়ার আগে তিনি সিঙ্গাপুরের মোস্তফা সেন্টারে গিয়েছিলেন। জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মাস্ক কিনতে মোস্তফা সেন্টারে লোকজনের ভিড় লেগেই আছে। ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে মাস্ক কিনতে সেখানে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন ধরে থাকছে। দেশটিতে এছাড়া আর কোথাও মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে না।

করোনা ভাইরাস বিস্তারে চীনের পর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জাপান। জাপানে আক্রান্ত হয়েছে ৯০ জন। তৃতীয় স্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর, সেখানে সর্বশেষ বাংলাদেশিসহ ৪৩ জন আক্রান্ত হয়েছে।

এদিকে করোনা ভাইরাসে চীনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯০৮ জনে দাঁড়িয়েছে। চীনের বাইরে হংকং ও ফিলিপাইনে ১ জন করে মোট ৯১০ জন নিহত হয়েছে। এ ভাইরাসে চীনে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০ হাজার ১৭১ জন এবং চীনের বাইরে ৩৮৩ জন। সবমিলিয়ে পুরো বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০ হাজার ৫৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩ হাজার ৩৪২ জন। সোমবার দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন এ তথ্য জানিয়েছে। খবর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

প্রতিদিনই করোনায় মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে সাথে আতঙ্ক, ভয় ও শঙ্কা। শুধুমাত্র গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ৯৭ জন, যা একদিনে সবচেয়ে বেশি মারা যাওয়ার রেকর্ড। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসে ৯১০ জন মারা গেছে। যা ২০০২-২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার রেকর্ড ছাড়িয়েছে।

সোমবার সকালে চায়নার জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন জানিয়েছে, চীনে গত এক দিনেই আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ৬২ জন। এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ৪০ হাজার ১৭১ জন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৫০০ জনের অবস্থা ভয়াবহ বলে জানানো হয়েছে।

হুবেই প্রদেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হুবেইতে নতুন করে ২ হাজার ৬১৮ জন আক্রান্তের খবর নিশ্চিত করেছে। এ নিয়ে প্রদেশটিতে নিহত হয়েছে ৮৭১ জন, আক্রান্ত হয়েছে ২৯ হাজার ৭১৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯৭ জনের মধ্যে শুধু হুবেইতে ৯১ জন, বাকি ৬ জন মারা গেছে চীনের অন্যান্য এলাকায়। হুবেইতে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৮০০ জন সুস্থ হয়েছে।

হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান, যেখানাকার একটি সামুদ্রিক খাদ্য ও মাংসের বাজার থেকে এই করোনা ভাইরাসটির উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভাইরাসটি যাতে ছড়িয়ে না যায়, সেজন্য চীন হুবেই প্রদেশকে পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ওই অঞ্চলের সাথে সকল ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে চীনসহ বাইরের বিশ্ব থেকে।

এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ আক্রান্তের খবর আসছে, তাতে আক্রান্তের আসল খবর জানা যাচ্ছে না। কারণ, ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, শুধু তাদের হিসেব পরিসংখ্যানে ধরা হচ্ছে। তাই এর প্রকৃত হিসেব বের করা বা জানা খুবই কঠিন ব্যাপার, যা আরেকটি আশঙ্কার কারণ।

চীনের সবগুলো প্রদেশসহ বিশ্বের ২৫টি দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। চীনের বাইরে এ পর্যন্ত ২৭০ জন আক্রান্ত শনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।

ভাইরাস সংক্রমণের কারণে চীন ভ্রমণে সতর্কতা, নিষেধাজ্ঞা জারি এবং কড়াকড়ি আরোপ করেছে অনেক দেশ। ভারত, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশ চীন থেকে আগত যাত্রীদের ভিসা বাতিল করেছে। ভাইরাসের কারণে, বিশ্বের অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের চীন ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। চীনে অধিকাংশ বিমান সংস্থার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্সসহ আরও অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের চীন থেকে সরিয়ে নিচ্ছে।

গুয়াংডং-সহ দেশটির যেসব প্রদেশের বাসিন্দা ৩০ কোটির বেশি সেসব শহরে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু দেশটির কারখানাগুলোতে দিনে মাত্র ২ কোটি মাস্ক তৈরির সক্ষমতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চীনের শিল্প-প্রতিষ্ঠানবিষয়ক বিভাগের মুখপাত্র তিয়ান ইউলং। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ ইউরোপ, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাস্ক আনার পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, কাজাখস্তান, হাঙ্গেরিসহ বিশ্বের আরও বেশ কয়েকটি দেশ মেডিকেল সহায়তায় হাত বাড়িয়েছে।

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২০টির মতো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

চীন, থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম, হংকং, সিঙ্গাপুর, ভারত, মালয়েশিয়া, নেপাল, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ান ও ইসরায়েলস ২৫টি দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগীকে শনাক্ত করা হচ্ছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন