নাবিকের সমুদ্র কথন-(তৃতীয় পর্ব) : ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ মাহমুদ

0
66
দেখা হয়েছে
শান্ত প্রশান্ত - ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ মাহমুদ

আজ চতুর্থ দিনে ঘুম ভাঙল এক শান্ত পরিস্থিতিতে। ঝলমলে রোদ, দিগন্ত বিস্তৃত লম্বা ঢেউগুলো এখনও সাপের মত বুকে হেটে চলছে, কিন্তু তা অনেকটা অলস অজগরের মত, কাল নাগিনীর উদ্ধত ফনা আর নেই। সাথে সাগরের পানিও নীল হয়ে গেছে, আকাশে বিক্ষিপ্ত কিছু মেঘ, তাও অধিকাংশ সাদা। এরকম রুপ দেখেই হয়ত কেউ নাম রেখেছিল প্যাসিফিক বা প্রশান্ত। সবাই সকাল থেকে কাজে নেমে গেছে, যে ডেকে গত তিন দিনে কারো পারা পরেনি, আজ তা মুখরিত।

প্রথম কাজ সব স্টোররুম গুলি পরীক্ষা করে দেখা, নোঙর, সিড়ি ও ক্রেন সহ যেসব জিনিষ শক্ত করে বেধে রাখা হয়েছিল তাদের বাধন ঢিলে হয়েছে কিনা দেখে নেয়া। সকাল থেকে এসব কাজেই ব্যাস্ত রইল এক দল। তবে মানির মান আল্লায়ই রাখে, তিন দিন কান ধরে উঠ বস করানো হয়েছে, কিল ঘুষি লাথি গুতা সবই দেয়া হয়েছে ইচ্ছে মত, কিন্তু তারপরেও কোন হাড় হাড্ডি ভাঙ্গে নি, কিংবা কোন রক্তও বেরোয় নি। আবহাওয়ার সাথে সাথে সবার মেজাজও বেশ ভালো হয়ে যায়, খিট খিটে ভাব, কপালের ভাজ সবই কেমন যেন অদৃশ্য, তাই মানুষ জনকে দেখতেও বেশ হাসি খুশী মনে হচ্ছে।

ছোট বেলা আমরা সবাই কম বেশী চিড়িয়াখানায় গিয়েছি। এমনকি বুড়ো বয়সেও ভালো চিড়িয়াখানা বা সাফারি পার্কে ঘুরতে খারাপ লাগেনা। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে চিড়িয়াখানাতে শান্তশিষ্ঠ গাধা কিংবা নীল গাইয়ের খাচার সামনে তেমন ভীর থাকবে না। সবাই ভীর করে হিংস্র বাঘ কিংবা সিংহের খাচার সামনে। বেদেরা যখন সাপ খেলা দেখায়, দেখা যাবে একটি বিশাল দেহী অজগর কে এক কোনায় ফেলে রাখা হয়েছে, আর সে ও মরার মত শুয়ে শুধু চোখ পিট পিট করছে, কেউ তার দিকেও ফিরেও তাকাচ্ছে না।

সবাই চরম উতকন্ঠায় অপেক্ষা করছে কখন ফনা তোলা হিংস্র গোখড়া বা কাল নাগিনীকে বের করা হবে। সার্কাসেও আমরা জিমনাস্টিকের দারুন কসরত দেখে ততটা বিনোদিত হই না, যতটা হই চোখ বেধে চাকু ছোড়া দেখে। আসলে অদ্ভুত এই মানব প্রজাতি, আমরা যে জিনিষগুলোকে সবচেয়ে বেশী ভয় পাই, সে জিনিষগুলিই সবচেয়ে বেশী উপভোগ করি। আমরা সবচেয়ে আরামদায়ক গাড়িটি কিনি ব্যাবহারের জন্য, সবচেয়ে ভালো কোম্পানির বাসে ভ্রমন করি যেখানে কোন ঝাকুনি হবে না, কিন্তু আবার অনেক টাকার টিকিট কেটে নাগর দোলা কিংবা রোলার কোস্টারে চড়ি।

পৃথিবীর সৌন্দর্য্যও মনে হয় অনেকটা এরকমই। বিমানের টিকেট কেটে ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুর গিয়ে ঝক ঝকে বিল্ডিং আর ঝলমলে শপিং মল প্রথম দেখায় কিছুটা ভালো লাগলেও স্বল্প সময়েই এদের রুপ একঘেয়ে হয়ে যায়। কিন্তু লোকাল বাসে চড়ে গ্রামে গিয়ে ভাঙাচোরা রাস্তায় ভ্যানের পেছনে চড়ে ঘুরতেও ভালো লাগে। এসি নেই এমনকি ফ্যান ও নেই, স্যাটলাইট টিভি নেই, গ্যাসের চুলো নেই, তার পরেও ধোয়ায় সয়লাব লাকড়ির চুলোর রান্না অমৃতসম। পৃথিবীর আনাচে কানাচে প্রকৃতি যেখানে যত সৌন্দর্য্য ধারন করে আছে, তার সাথে কস্ট জড়িত। সুন্দর বন দেখতে হলে কাদা মাটিতে হাটতে হবে, জোকের কামর খেতে হবে। পাহাড় পর্বতের সৌন্দর্য্য দেখতে হলে চরাই উতরাই বেয়ে উঠতে হবে, বরফের সৌন্দর্যের জন্য ঠান্ডা সহ্য করতে হবে।

এক সময় সাহারা মরুভুমি, কিংবা হিমালয় পর্বতমালা ছিল সাধারন মানুষের ধরাছোয়ার বাইরে। শুধু যারা ছিল দুঃসাহসী এডভেঞ্চার প্রিয়, তাদের পক্ষেই এসব দেখা সম্ভব হত। কিন্তু প্রযুক্তির উতকর্ষতায়, সব কিছুই মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কয়েকশ ডলারের বিনিময়ে প্লেন এভারেস্টের কাছ দিয়ে ঘুরিয়ে আনে। আলাস্কার বরফ ঢাকা দুর্গম এলাকা কিংবা আফ্রিকার গহিন জঙ্গল, গোবি মরভুমির রুক্ষ অঞ্চল কিংবা আল্পস এর চরাই উৎরাই, যেকোন যায়গায়ই আজকাল পর্যটকরা জন্য যেতে পারে। প্রকৃতির এরকম ভয়ংকর সৌন্দর্যমন্ডিত এলাকার মাঝে সবচেয়ে অপরুপ হল উত্তাল সমুদ্র।

চারিদিকে যতদুর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি, তার মাঝে একাকি একটি জাহাজ, বিশাল সব ঢেউ দিগন্ত থেকে ছুটে আসছে ভয়ংকর ফনা তুলে, ঝড়ো হাওয়ায় নীল সাগর সাদা হয়ে গেছে, এর মাঝে কখনো হয়তো রোদ, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘন কালো অন্ধকার মেঘ আর বিদ্যুতের চমক। ঢেউ আসছে, ছোট বড় মাঝারি, আর মাঝে মাঝে দু তিন তলা বিল্ডিং এর মত উচু দু একটা তেরে আসছে মাথা উচিয়ে। অন্ধকার রাতের সমুদ্রে তান্ডব চোখে পরে না, কিন্তু বাতাসের শো শো আওয়াজ জানিয়ে দেয় ভয়ংকর দানব একদম সন্নিকটে, দেখা যাচ্ছে না কিন্তু তার নিঃশ্বাস ঘাড়ে এসে পড়ছে। এমন সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকালে কালো অন্ধকার সমুদ্রে সাদা ঢেউ গুলি কে মনে হয় পৈচাশিক হাসি। সাগরের এই ভয়ংকর রূপ টুকু এখনও পর্যন্ত শুধুই নাবিকের। হ্যারিকেনের অ্যাটল্যান্টিক কিংবা টাইফূনের প্যাসিফিকে কোন যাত্রিবাহী জাহাজ যায় না, যায় না কোন বিমান বা হেলিকপ্টার। এখনও পর্যন্ত কোন টুরিস্ট কোম্পানি সাইক্লোন দেখানোর প্যাকেজ অফার করেনি। কোন মুল্যেই নিরাপদ অবস্থানে থেকে সমুদ্রের ভয়াল রূপ দেখা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক নাবিকদের দেখতে হয় প্রকৃতির এই অদ্ভুত চেহারা। হয়তবা এজন্যই সৃস্টিকর্তার কাছে নাবিকদের কোন অভিযোগ থাকবেনা, কারন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শেষ বিন্দুটুকু তিনি দেখিয়েছেন।
শান্ত প্রশান্ত – ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আপনার মন্তব্য লিখুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন